লালমনিরহাটে শিশু নন্দিনী কান্ত রায় হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী গ্রাম। এ ঘটনায় পুলিশ সুপার (এসপি), ওসিসহ অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন এবং জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ প্রশাসনের ৭টি যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হককে ক্লোজড (প্রত্যাহার) করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে আদিতমারী উপজেলার ফলিমারী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত নন্দিনী কান্ত রায় (৭) ওই গ্রামের নলিনী কান্ত রায়ের মেয়ে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল থেকে নিখোঁজ ছিল নন্দিনী। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা অনেক খোঁজাখুঁজির পর মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে সন্দেহ করেন। পরে মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে লালমনিরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
স্থানীয়দের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় বিধান চন্দ্র রায় (২২) নামে এক যুবককে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে ফিরতে দেখা গিয়েছিল। এ সন্দেহে বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে গিয়ে ভাঙচুর চালায় এবং আত্মগোপনে থাকা বিধানকে আটক করে। পরে পুলিশ তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
এ সময় অভিযুক্তকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে অবরুদ্ধ করে রাখে এবং হামলা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে যান লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, ক্রাইম সিন ইউনিট, জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, ফায়ার সার্ভিস ও বিজিবি সদস্যরা। তারাও জনতার অবরোধের মুখে পড়েন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হলে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমামসহ জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। প্রায় তিন ঘণ্টা তারা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন বলে জানা গেছে।
পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র ও তার বাবাকে নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগের সময় প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। এতে পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকাসক্ত বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী শিশু নন্দিনীকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা করে এবং মরদেহ মাটিচাপা দেয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের আগে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করেনি।
জানা যায়, নিখোঁজের ঘটনায় আগের দিন জিডি গ্রহণ না করার অভিযোগে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হককে ক্লোজ করা হয়েছে।
লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছে। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং কয়েকটি সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। নন্দিনী হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিধান চন্দ্র ও তার বাবাকে আটক করা হয়েছে। সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় পৃথক মামলাও করা হবে।’
জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান বলেন, ‘শিশু নন্দিনী হত্যার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আপাতত ওসিকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।’
কেকে/ এমএস