সোমবার, ২২ জুন ২০২৬,
৮ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
শিরোনাম: ভূমিকম্পে কাঁপলো রাজধানী      চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী      ৯ বিষয়ে একমত বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া      হামের উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু      ঢাকায় ১১ দলের সমাবেশ মঙ্গলবার      যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ      আ. লীগের নাশকতার আশঙ্কায় ৬ জেলায় সেনা মোতায়েনের নির্দেশ      
অর্থনীতি
চা শিল্পে শ্রমিক জেসমিনের নতুন ইতিহাস
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬, ১০:০১ পিএম
জেসমিন আক্তার

জেসমিন আক্তার

বাংলাদেশের চা শিল্পে নতুন এক ইতিহাস গড়েছেন বাগানের শ্রমিক জেসমিন আক্তার (৫৮)। চা-পাতা চয়নে অসাধারণ দক্ষতা ও দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি টানা তৃতীয়বারের মতো ‘জাতীয় চা পুরস্কার’ অর্জন করেছেন। দেশের ইতিহাসে এ অর্জন তাকে সবচেয়ে আলোচিত ও সফল চা-শ্রমিকদের কাতারে নিয়ে গেছে।

শনিবার (২০ জুন) মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসের অনুষ্ঠানে জেসমিন আক্তারের হাতে পুরস্কার তুলে দেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী। 

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান উপস্থিত ছিলেন। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য তিনি ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৯ টাকার চেক, ট্রফি ও সনদ লাভ করেন।

চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় মাত্র ৩০ মিনিটে ১৩ কেজি চা পাতা চয়ন করে তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সংগ্রহ করেন মাত্র ৯ দশমিক ৫ কেজি পাতা। এছাড়া ২০২৫ সালে তিনি মোট ২৫ হাজার ৬২১ কেজি চা পাতা সংগ্রহ করেন, যা তাকে জাতীয় পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে।

কুমিল্লার মেয়ে জেসমিন মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ের পর চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আসেন। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে স্বামী আবদুল বারেকের সঙ্গে নেপচুন চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৪ সাল থেকে টানা ৪২ বছর ধরে তিনি চা-পাতা চয়ন করে আসছেন।

জানা গেছে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হওয়ার পর কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আসেন জেসমিন আক্তার। নতুন সংসার, সীমিত আয় আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সব মিলিয়ে তখন জীবন ছিল কঠিন সংগ্রামের। সংসারের খরচ মেটাতে স্বামী আবদুল বারেকের সঙ্গে যোগ দেন নেপচুন চা বাগানের কাজে। সেই যে হাতে তুলে নেন চা-পাতার ঝুড়ি, চার দশকেরও বেশি সময় পর সেই শ্রমই এনে দিয়েছে জাতীয় স্বীকৃতি। জেসমিনের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার আগেই। প্রতিদিনের মতো তিনি চা বাগানের সবুজ ঢালে ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেন দুইটি পাতা ও একটি কুঁড়ি। বছরের পর বছর ধরে এই কাজের মধ্যেই খুঁজে পেয়েছেন জীবনের অর্থ ও সাফল্য। 

তার এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে নিরলস পরিশ্রম এবং কাজের প্রতি গভীর নিষ্ঠা। শুধু জেসমিন নন, তার পুরো পরিবারই চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। স্বামী, দুই ছেলে, দুই পুত্রবধূ, এক মেয়ে ও জামাইসহ পরিবারের আট সদস্য একই বাগানে কাজ করেন। দীর্ঘদিনের এই শ্রমেই টিকে আছে তাদের সংসার। টানা তিনবার দেশের শ্রেষ্ঠ চা-পাতা চয়নকারী নির্বাচিত হয়ে জেসমিন আক্তার শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করেননি, বরং বাংলাদেশের লাখো চা শ্রমিকের পরিশ্রম ও সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। 

জেসমিন আক্তার বলেন, ‘মাত্র ১৬ বছর বয়সে চা বাগানের কঠিন সংগ্রাম শুরু করি। গত ৪২ বছর ধরে কঠোর শ্রম করে আসছি চা শিল্পে। প্রথমবার পুরস্কার পাবার পর নিজের প্রতি বিশ্বাস বাড়ে। পরে দ্বিতীয়বার পুরস্কার পাই। আর এবার পেলাম তৃতীয়বারের মতো পুরস্কার। শুধু আমি একা চা বাগানে কাজ করছি না। চা বাগানের সাথে আমার পরিবারের রক্ত-ঘাম মিশে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ছাড়াও আমার স্বামী, আমার দুই ছেলে, দুই ছেলের বউ, এক মেয়ে, মেয়ের জামাই মিলে মোট ৮ জন চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাচ্ছি। আমরা সবাই চা-বাগানের শ্রমিক পেশায় থাকলেও স্বপ্ন দেখছি নাতি-নাতনিরা লেখাপড়া করে মানুষের মতো মানুষ হোক। তারা অন্য পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে সুন্দর জীবনযাপন করলে আমার ভালো লাগবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে সংসার, কাজের জায়গা যেখানেই কাজ করেছি সেখানেই মন দিয়ে নিজের কাজ করার চেষ্টা করেছি। কখনো পুরস্কারের কথা চিন্তা করিনি। সংসারের জন্য কাজ করেছি, নিজের দায়িত্ব পালন করেছি। আজ জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি পেয়ে খুব ভালো লাগছে।’

জেসমিন আক্তার জানান, চা-পাতা তুলতে ভোরবেলা বাড়ি থেকে বের হন। সারা দিন পাতা তোলা শেষে ফেরেন সন্ধ্যায়। কাজের ফাঁকে বিরতিও কম নেন। এসব কারণেই সফলতা এসেছে বলে মনে করেন তিনি। 

বেশি পাতা তোলার কৌশল সম্পর্কে জেসমিন আক্তাতার বলেন, তিনি ভোর পাঁচটায়  বের হন। হাত চালু করে কাজ করেন। কোনো অলস সময় পার করেন না। কাজের ফাঁকে বিরতিও কম দেন। আর আড়াই পাতি পাতা (দুইটি পাতা একটি কুঁড়ি) একসঙ্গে তুলে নিলে ভালো হয়। রোদ-বৃষ্টি হোক আর প্রতিকূল পরিবেশ হোক না কেন, কখনো থেমে থাকেননি উল্লেখ করে জেসমিন বলেন, শুধু পরিশ্রম করলেই হয় না, কৌশলও জানতে হয়। সবাই পাতা তোলে রুটিন অনুসারে। কিন্তু সবাই তো আর দেশসেরা হতে পারে না। এ জন্য দরকার দ্রুত বেশি পাতা তোলার কৌশল। দুই হাত সমানতালে চালিয়ে কাজ করেছি। সফলতা পেয়েছি। এক ঘণ্টায় সর্বোচ ৪৮ কেজি চা পাতা তুলেছি। দিনে আড়াই শ কেজিও হয়। দুপুরের খাবার সকালে সঙ্গে নিয়ে বের হন জেসমিন। বাগানে কাজের ফাঁকে  খেয়ে নেন। ১২ ঘণ্টা কাজের মধ্যে ১ ঘণ্টা পারলে জিরিয়ে নেন। 

চা-শ্রমিক জেসমিন আক্তারের মূল বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। তবে তিনি চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার ইস্পাহানী গ্রুপের নেপচুন চা বাগানের একজন স্থায়ী শ্রমিক। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এ চা বাগানটিতে তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে একটানা শ্রমিক হিসেবে কর্মরত। ৪২ বছরের চা পাতা চয়নের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ জেসমিন চা-পাতা চয়নে অসাধারণ দক্ষতার কারনে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় চা দিবস, ২০২৫ সালে অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় চা দিবসে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট লাভের পর শনিবার ২০২৬ সালে ষষ্ঠ জাতীয় চা দিবসে দেশসেরা হয়ে হ্যাট্রিক করেন।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নেপচুন চা বাগানের বয়স্ক শ্রমিক জেসমিন আক্তার মোট ২৫ হাজার ৬২১ কেজি চা পাতা চয়ন করেন। এর ফলে তিনি ২০২৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় চা পুরস্কারের জন্য আরও একাধিক জনের সাথে প্রাথমিক তালিকাভূক্ত হন। প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত শ্রমিকরা অবতীর্ণ হন চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায়। সেখানে জেসমিন আক্তার ৩০ মিনিটে ১৩ কেজি চা পাতা চয়ন করে প্রথম স্থান লাভ করেন। আর দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী শ্রমিক ৩০ মিনিটে চয়ন করেন মাত্র সাড়ে ৯ কেজি পাতা। জেসমিনের এই অর্জনে আনন্দিত সহকর্মী ও বাগান কর্তৃপক্ষও। 

এ ব্যাপারে নেপচুন চা বাগানের ব্যবস্থাপক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, ‘জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ চা পাতা চয়নকারী জেসমিন খুবই কর্মনিষ্ট ও পরিশ্রমী এক শ্রমিক। বয়স ৫৮ বছর হলেও তিনি প্রমাণ করেছেন, নিষ্ঠা ও পরিশ্রম থাকলে একজন শ্রমিকও জাতীয় পর্যায়ে সম্মান অর্জন করতে পারেন। জেসমিনের সাফল্য আমাদের সবার জন্য গর্বের।’

কেকে/এমএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  চা শিল্প   শ্রমিক জেসমিনের ইতিহাস  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

অর্থনীতি- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: kholakagojnews@gmail.com, kholakagojadvt@gmail.com

© 2025 Kholakagoj
🔝
close