অনলাইন জুয়ার ভয়াল থাবা দেশের যুবসমাজকে অর্থনৈতিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে সমাজে মাদকাসক্তি ও অপরাধ প্রবণতাও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও দ্রুত ধনী হওয়ার লোভকে কাজে লাগিয়ে দেশি ও বিদেশি চক্রগুলো তরুণ ও যুবসমাজকে এ আসক্তির দিকে টেনে নিচ্ছে। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবার ও সমাজে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন জুয়া মাদকাসক্তির মতোই ভয়াবহ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর। কারণ এটি মানুষের মস্তিষ্কের আনন্দ ও পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্ষতির পরও খেলোয়াড়রা পুনরায় অর্থ বিনিয়োগ করে হারানো টাকা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন, যা শেষ পর্যন্ত আরও বড় ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়।
তবে অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ম্যাচ ফিক্সিং প্রতিরোধে কঠোর দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাশাপাশি জুয়া প্রতিরোধ বিল জাতীয় সংসদে পাস করেছে সরকার।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বিদেশি চক্র অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করছে। এসব কার্যক্রমে দেশের কিছু এজেন্ট ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) সঙ্গে জড়িত অসাধু ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অনলাইন জুয়ার জনপ্রিয় কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে স্পোর্টস বেটিং, ক্যাসিনো গেম, টেবিল গেমসহ বিভিন্ন ধরনের জুয়া পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন খেলোয়াড়দের যুক্ত করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন জুয়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি, অপরাধপ্রবণতা এবং সহিংস ঘটনার সংখ্যাও বেড়েছে বলে বিভিন্ন ঘটনার উদাহরণ উঠে এসেছে। চলমান ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে নতুন নতুন কিশোর-তরুণ জড়িয়ে পড়ছে অনলাইন বাজিতে। সর্বস্ব হারিয়ে অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে, শেষ পর্যন্ত পরিবারের উদ্যোগে ঠাঁই হচ্ছে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে।
বরিশালের বিভিন্ন মাদক নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসেই অনলাইন জুয়ার কারণে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরবর্তীতে মাদকাসক্ত হয়ে পড়া ১২৩ জন তরুণকে জেলার ছয়টি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করেছে তাদের পরিবার।
বরিশাল নগরীর এক তরুণ জানান, এইচএসসি পাস করার পর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ধীরে ধীরে আসক্ত হয়ে গত দুই মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা হারান।
তিনি বলেন, ইয়াবা ও গাঁজা সেবনের পাশাপাশি অনলাইন জুয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাতে শুরু করি। বিশ্বকাপ এলেই নতুন করে অনেক তরুণ এই জুয়ার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্ধু কিংবা পরিচিতজনের মাধ্যমে অধিকাংশ তরুণ প্রথমবার অনলাইন বাজির প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হন। একবার আসক্ত হওয়ার পর জুয়ার টাকা জোগাড় এবং লোকসানের হতাশা কাটাতে অনেকেই মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সেখান থেকে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধেও জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে যশোরের কেশবপুরে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়া। এমনকি ঘটছে আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও। উপজেলার গৌরীঘোনা ইউনিয়নের কাশীমপুর গ্রামের মতলেব গাজীর ৩৮ বছর বয়সি ছেলে মিজানুর রহমান সম্প্রতি অনলাইন জুয়ার নীল দংশনের শিকার হয়েছেন। দ্রুত লাভের আশায় জুয়ার সাইটে টাকা খাটাতেন মিজানুর। একপর্যায়ে সব হারিয়ে এবং ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। উপায়ান্তর না দেখে শেষ পর্যন্ত কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই জুয়া ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কাজ করছে এক ধরনের ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা নেটওয়ার্কিং। উপজেলার গড়ভাঙ্গা বাজারের একজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে আসল রহস্যটি ফাঁস করেন। তিনি জানান, বাজারে বসে প্রকাশ্যে বা গোপনে অনেকেই মোবাইলে জুয়া খেলে। এদের মধ্যে কেউ হঠাৎ সামান্য কিছু টাকা জিতলে, সেটার স্ক্রিনশট বা গল্প অন্যদের দেখায়। এই সাময়িক লাভ দেখে প্রলুব্ধ হয়ে পাশে থাকা আরও পাঁচজন নতুন করে এই নেশায় টাকা ঢালতে শুরু করে। এভাবেই একজন থেকে অন্যজনে ক্যানসারের মতো ছড়াচ্ছে এই আসক্তি।
অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে তৎপর রয়েছে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে তারা। সম্প্রতি রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন বিদেশি নাগরিকসহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে অনলাইন জুয়া পরিচালনার নানা তথ্য উঠে এসেছে। তদন্তে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার কিছু অপব্যবহারের বিষয়ও সামনে এসেছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ইউনিটের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনলাইন জুয়ার বিস্তার রোধে নিয়মিত সাইবার নজরদারি চালানো হচ্ছে। তবে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং চক্র জড়িত থাকায় তদন্তে নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
এদিকে সিআইডি জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শত শত ওয়েবসাইট শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জুয়ার লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজন অসংখ্য মোবাইল ব্যাংকিং ও ব্যাংক হিসাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ চলছে।
জুয়া প্রতিরোধ বিল সংসদে পাশ
অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং ম্যাচ ফিক্সিং প্রতিরোধে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের লক্ষ্যে ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাশ হয়েছে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেন।
বিলটি উত্থাপনকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর জুয়া কার্যক্রমের দ্রুত বিস্তার মোকাবিলায় নতুন আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে। বর্তমানে জুয়া প্রচলিত আসর থেকে স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘অনলাইন জুয়া এখন শুধু সামাজিক সমস্যা নয়; এটি সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক অপরাধেরও বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীর সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করে এবং অর্থপাচারের পথও তৈরি করতে পারে। তাই আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সরকারের মতে, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে জুয়ার ধরন ব্যাপকভাবে বদলে গেছে, যা জনশৃঙ্খলা, সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাইবার অপরাধ তদন্তকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশভিত্তিক ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে পরিচালিত অনলাইন বেটিং চক্রের বিস্তার নিয়ে সতর্ক করে আসছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক জুয়ার প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় ব্যবহারকারী যুক্ত করার অভিযোগে পরিচালিত একাধিক অবৈধ বেটিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। তদন্তে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং ডিজিটাল পেমেন্ট চ্যানেলের মাধ্যমে জুয়াসংক্রান্ত লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অধিকাংশ অনলাইন জুয়া প্ল্যাটফর্ম সীমান্ত অতিক্রম করে পরিচালিত হওয়ায় বিদ্যমান আইন দিয়ে এগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। এ কারণে নতুন আইনে শুধু জুয়া খেলাকেই নয়, অবৈধ জুয়ার আয়োজন, পরিচালনা, সহায়তা, প্রচার কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ফুটবল লিগ এবং ই-স্পোর্টস প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে তরুণদের মধ্যে অনলাইন বেটিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত জুয়া আর্থিক সংকট, পারিবারিক বিরোধ, উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। অনলাইনে ব্যক্তিগত পরিসরে জুয়া খেলা হওয়ায় আসক্তি শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
কেকে/ এমএস