মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬,
২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: চাঁদপুরে যাত্রীবাহী বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৩, আহত ১৫      বিএনপির পরিকল্পনা-কর্মসূচি সবসময়ই জনবান্ধব : প্রধানমন্ত্রী      প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী      হাসিনা ও হাদি হত্যাকারীদের ফেরাতে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের অনুরোধ      প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের বৈঠক      শহর-গ্রামে ডেঙ্গুর ভয়      চমক আসছে মন্ত্রিসভায়      
খোলাকাগজ স্পেশাল
যত্রতত্র অনুমোদনহীন ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার
মো. এহসানুল হক, মৌলভীবাজার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬, ১:২৮ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও অদক্ষ চালক তৈরির অন্যতম উৎস অনুমোদনহীন ও নবায়নবিহীন ড্রাইভিং স্কুলগুলোর বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ আইনি পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। 

মৌলভীবাজারে অনুমোদন ছাড়াই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার। নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে মৌলভীবাজার শহর এবং বিভিন্ন উপজেলায় দাপটের সাথে চলছে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। যথাযথ তদারকি ও মনিটরিং না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেকেই সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন, যা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ রাস্তার মোড়ে মোড়ে কিংবা ওভার ব্রিজে বিভিন্ন ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করছে তারা। সেখানে নারীদের জন্যে নারী প্রশিক্ষকসহ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। 

এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিআরটিএ দায় এড়িয়ে গেলেও যাত্রীরা বলছেন, অদক্ষদের ‘চালক’ বানিয়ে দেওয়ায় সড়কে নিয়মিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হওয়া জরুরি। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসব ড্রাইভিং স্কুল বা ট্রেনিং সেন্টারে না আছে অনুমোদিত প্রশিক্ষক, নেই প্রশিক্ষণের জায়গা। শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার শহরের ব্যস্ত সড়কেই অনেক প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণ দিতে দেখা যায়। ওইসব গাড়ির চালক প্রশিক্ষণার্থী হওয়ায় যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় কবলে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটেও। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হলো দক্ষ চালকের ঘাটতি। আর এই ঘাটতির সুযোগ নিয়ে জেলার শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার সদর উপজেলাসহ জেলার আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠেছে শতাধিক অনুমোদনবিহীন ড্রাইভিং স্কুল ও ট্রেনিং সেন্টার। 

জেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা যায়, ছোট ছোট সাইনবোর্ড টাঙিয়ে অস্থায়ী অফিস খুলে চলছে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। কোথাও নেই পর্যাপ্ত খোলা জায়গা, নেই নির্ধারিত প্রশিক্ষণ মাঠ কিংবা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। অনেক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ করছেন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিরা, যাদের দক্ষতা ও বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) মৌলভীবাজার এর তথ্য অনুযায়ী, জেলা শহরে অনুমোদিত ড্রাইভিং ট্রেনিং স্কুলের সংখ্যা মাত্র একটি। অথচ শুধু মৌলভীবাজার শহরেই অবৈধ ড্রাইভিং স্কুল রয়েছে ১২টি। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে মৌলভীবাজার কোর্ট রোড, বেরীরপার, জুগিডর, কুলাউড়া রোড, চাঁদনীঘাট, শাহ মোস্তফা রোড, আখাইলউড়া, শহরের কুসুমবাগ, কুদালীপুল এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলার হবিগঞ্জ রোড, পৌর সুপার মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে নামসর্বস্ব সাইনবোর্ড টানিয়ে ট্রেনিং সেন্টার পরিচালনা করে আসছেন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণেই এসব ট্রেনিং সেন্টারের মালিকরা প্রশিক্ষণের নামে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। 

উদ্বেগের সঙ্গে স্থানীয়রা জানান, অনেক ড্রাইভিং স্কুলের ভেতরে অন্য ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কোথাও গ্যারেজ, কোথাও গাড়ির পার্টস বিক্রি, আবার কোথাও অফিস ভাড়া দিয়ে একই স্থানে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে প্রশিক্ষণের পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ৬৩ ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও, যেখানে অনুমতি ছাড়া ট্রেনিং সেন্টার চালালে জেল ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেই আইন কার্যকর না হওয়ায় বেআইনি সেন্টারগুলো দাপটের সাথে চলছে। 

মৌলভীবাজার চুবড়া এলাকার বাসিন্দা মো. মিসবাহ নামে এক যাত্রী বলেন, কম সময়ে ড্রাইভিং শেখানোর পাশাপাশি দ্রুত লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রশিক্ষার্থী নেয় এসব প্রতিষ্ঠান। আর এভাবে অদক্ষ চালকরা রাস্তায় গিয়ে প্রতিনিয়তই দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সরকারি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বাড়ানোর পাশাপাশি এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। 

টিআইবির সহযোগি প্রতিষ্ঠান অ্যকটিভ সিটিজে গ্রুপ শ্রীমঙ্গল’র সদস্য আশিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘একটা গাড়ি রাখার পর্যন্ত জায়গা নেই, অথচ একটি ছোট ঘরে কিছু সাইনিং সিগন্যাল দিয়ে লিখে রাখা হয়েছে ড্রাইভিং ট্রেনিং সেন্টার বা ড্রাইভিং স্কুল। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে একজন প্রশিক্ষিত যোগ্য ও দক্ষ চালক তৈরি সম্ভব নয়।’

নিরাপদ সড়ক চাই শ্রীমঙ্গল’র সদস্য কামরুল হোসেন বলেন, ‘দেশে সংঘটিত বহু সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে অপর্যাপ্ত ও নিম্নমানের প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। একজন চালকের শুধু গাড়ি চালানো জানলেই হয় না; ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং মানবিক আচরণ সম্পর্কেও সঠিক প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু বেশিরভাগ অবৈধ ড্রাইভিং স্কুলে এসব বিষয়ে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয় না।’

সড়ক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে  দেশে মোটরযানের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সেই তুলনায় দক্ষ চালক তৈরির কার্যকর উদ্যোগ খুবই সীমিত। এই সুযোগে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী শুধুমাত্র আর্থিক লাভের আশায় অবৈধ ড্রাইভিং স্কুল পরিচালনা করছে। ফলে নতুন চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা কমে যাচ্ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। 

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যে, নিবন্ধনহীন ও নবায়নবিহীন ড্রাইভিং স্কুলগুলো অদক্ষ চালক তৈরি করে জননিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই বৈধতা যাচাই, নিয়মিত মনিটরিং, প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন এবং অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি। অনুমোদিত ড্রাইভিং স্কুল মালিকদের দাবি বিআরটিএ শক্ত অবস্থানে না গেলে এবং এই অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ না করলে দক্ষ চালক তৈরি সম্ভব নয়, ফলে  দেশের সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হবে। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে স্বজন হারানো সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন-আইন থাকতে কেন বাস্তবায়ন নেই।  

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে শুধু কঠোর আইন করলেই যথেষ্ট নয়, তার কার্যকর বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। দক্ষ, সচেতন ও প্রশিক্ষিত চালক তৈরি করতে হলে এখনই অবৈধ ড্রাইভিং সেন্টারগুলো বন্ধ এবং নিয়মিত মনিটরিং জরুরি। 

এ বিষয়ে মোটরযান ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ স্কুল স্থাপন ও পরিচালনার লাইসেন্সপ্রাপ্ত একমাত্র মোটর ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘মা মটর ড্রাইভিং স্কুল’-এর প্রোপাইটর ফারুক আহমেদ জানান- ‘‘দীর্ঘদিন ধরে মৌলভীবাজার কোর্ট রোড, বেরীরপার, জুগিডর, কুলাউড়া রোড, চাঁদনীঘাট, শাহ মোস্তফা রোড, আখাইলউড়া, শহরের কুসুমবাগ ও কুদালীপুল এলাকায় প্রায় ১২টির অধিক ড্রাইভিং স্কুল প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। এতে প্রশিক্ষণ নিতে আসা শিক্ষার্থীরা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অবহিত করা হলেও প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহন করা হয়নি।’’

জানতে চাইলে মৌলভীবাজার বিআরটিএ মোটরযান পরিদর্শক মো. সেলিম হাসান বলেন- ‘মা মটর ড্রাইভিং স্কুল’ সরকার অনুমোদিত। আমাদের রেকর্ড অনুযায়ী শহরে এটি ছাড়া অন্য কোনো ড্রাইভিং স্কুলের লাইসেন্স নেই। অবৈধ অন্যান্যদের বিরুদ্ধে অভিযানের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মৌলভীবাজার ট্রাফিক বিভাগের ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক (এডমিন) মো. কামরুল ইসলাম বলেন, নির্দেশনা দেওয়া আছে, যারা অবৈধভাবে প্রশিক্ষণরত গাড়ি সড়কে নিয়ে আসবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  অনুমোদন   ড্রাইভিং    ট্রেনিং সেন্টার  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close