রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৫ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ভয়াবহ নাশকতার ছক আওয়ামী লীগের      একাদশে ভর্তির চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, ভর্তি শুরু রোববার      রাজধানীতে পৃথক স্থানে তিন বাসে আগুন      রাজধানীতে চলন্ত বাসে আগুন      নতুন পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন জারি, কার্যকর হবে যেভাবে      বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জঙ্গল থেকে কুবি শিক্ষিকার নিখোঁজ ছেলের লাশ উদ্ধার      ঢাকায় নিরাপত্তা জোরদার, ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার ৫১৫      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ছিনতাইকারীর দখলে চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম ব্যুরো
প্রকাশ: রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৪১ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

রাতের অন্ধকার নয়, এখন দিনের আলোয়ও নিরাপদ নয় চট্টগ্রাম নগরীর সড়ক। ভোরে কর্মস্থলে ছুটে চলা মানুষ, ব্যস্ত সড়কের রিকশাযাত্রী কিংবা গণপরিবহনের যাত্রী—যে কেউ হয়ে উঠছেন ছিনতাইকারীদের টার্গেট। কখনো অস্ত্রের মুখে পথরোধ, কখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়, আবার কখনো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেলে এসে মুহূর্তেই মোবাইল, টাকা ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে চক্রগুলো।

সর্বশেষ শনিবার সকালে নগরের পাথরঘাটা সতীশ বাবু লেনে কোতোয়ালি থানার পেছনে রিকশাযাত্রীর পথরোধ করে ছিনতাইয়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলটি কোতোয়ালি থানার মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে। ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় আসা দুই যুবক একটি রিকশার পথ আটকে যাত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে।

ঘটনাটি পুলিশের নজরে এলেও ভুক্তভোগী এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর বলেন, ‘ঘটনাটি পুলিশের নজরে এসেছে। তবে ভুক্তভোগী অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেননি। জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশের টিম কাজ করছে।’

সতীশ বাবু লেনের এই ঘটনা অবশ্য বিচ্ছিন্ন নয়। ২০২৪ সাল থেকে নগরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ছিনতাই, অস্ত্রের ব্যবহার, যানবাহনে পথরোধ এবং সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতার ধারাবাহিক খবর পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালে এ প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন কৌশল। আর ২০২৬ সালে এসে কোটি টাকা মূল্যের স্বর্ণ লুট, ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই এবং ব্যস্ত সড়কে প্রকাশ্যে পথরোধের ঘটনাও সামনে এসেছে।

২০২৪ থেকেই ছিল সতর্কবার্তা : 

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় ছিনতাইয়ের ২০টি মামলা হয়েছিল বলে ওই বছরের অক্টোবরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তখন নগরবাসীর অভিযোগ ছিল, ছিনতাইকারীরা দিনের বেলাতেও প্রকাশ্যে অপরাধ করছে। বাধা দিতে গেলে হামলার আশঙ্কাও থাকছে। ওই বছর মার্চে কোতোয়ালি থানা এলাকায় ছয় ছিনতাইকারীকে চারটি ধারালো টিপছোরাসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জুনে বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় চারজনকে গ্রেপ্তারের সময় ছিনতাই হওয়া টাকা, টিপছোরা ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ করা হয়। 

জানুয়ারিতে স্টেশন রোড এলাকা থেকেও অস্ত্রসহ এক ছিনতাইকারী গ্রেপ্তারের খবর আসে। এসব ঘটনায় ছিনতাইকারীদের চলাফেরার ধরনও স্পষ্ট হয়। সিএনজি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিংবা মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ভুক্তভোগীকে অনুসরণ, পথরোধ কিংবা দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার কৌশল ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

২০২৫-এ আরও ভয়ংকর চিত্র : 

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নগরের ১৬ থানায় ডাকাতির দুটি, ছিনতাইয়ের সাতটি, হত্যার তিনটি, সিঁধেল চুরির ১২টি এবং চুরির ২৪টি মামলা হয়েছিল বলে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে একইসময়ে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও সবকটি সরকারি নথিতে আসেনি।

কারণ, ভুক্তভোগীদের একটি অংশ মামলা করতে চান না। কেউ সাধারণ ডায়েরি করেন, কেউ আবার কোনো অভিযোগই করেন না। ঝামেলা, হয়রানি কিংবা পরবর্তী জটিলতার আশঙ্কাই এর অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসে। ফলে সরকারি পরিসংখ্যানে প্রকৃত ঘটনার তুলনায় ছিনতাইয়ের সংখ্যা কম থাকার আশঙ্কা থেকেই যায়। ওই সময় একে খান, সিটি গেট, বাকলিয়া, নিউ মার্কেট-রেলস্টেশন, খুলশীর আমবাগান, পাহাড়তলী, হালিশহর, অক্সিজেন ও ষোলশহরের বিভিন্ন অংশকে ছিনতাইপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্যও আসে।

মার্চে পুরাতন রেলস্টেশন এলাকা থেকে ছুরি দেখিয়ে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই মাসে ছিনতাইয়ের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর অভিযুক্তদের একজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মে মাসে কোতোয়ালি এলাকায় ছয়জনকে গ্রেপ্তারের সময় ছোরা ও ছিনতাই করা স্বর্ণালংকার উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ। নভেম্বরে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। কোতোয়ালি থানার কাছাকাছি লালদীঘি এলাকায় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ইসমাইল হোসেন নামে এক যুবক নিহত হন। অর্থাৎ ছিনতাই এখন শুধু অর্থ ও মালামাল হারানোর ঝুঁকি নয়; প্রতিরোধ করলে তা প্রাণঘাতী হামলায়ও রূপ নিচ্ছে।

কোটি টাকার স্বর্ণ থেকে মোবাইল : 

চলতি বছরের শুরুতেই পাঁচলাইশের হামজারবাগ এলাকায় অস্ত্রের মুখে অটোরিকশা থামিয়ে ৩৫০ ভরি বা ৩৫টি স্বর্ণের বার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ওই স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা বলা হয়। পরে পুলিশ চাকরিচ্যুত এক সাবেক সদস্যসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার এবং ২৯০ ভরি স্বর্ণ উদ্ধারের কথা জানায়।

ফেব্রুয়ারিতে লালখান বাজার এলাকায় ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এক প্রবাসীর গাড়ি থামিয়ে স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগে দুজন গ্রেপ্তার হয়। এপ্রিলেও কোতোয়ালি এলাকায় ছিনতাইকারী চক্রের মূলহোতাসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর আসে। জুলাইয়ে কোতোয়ালি পুলিশ এক ছিনতাইকারীর কাছ থেকে ১১টি স্মার্টফোন উদ্ধারের কথা জানায়। আগস্টে শাহ আমানত সেতু এলাকায় পথরোধ করে ছিনতাইয়ের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, দুটি ছোরা ও লুণ্ঠিত মোবাইল ফোন উদ্ধারের কথা জানায় পুলিশ।

১১ মাসে ৯০ মামলা : 

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সিএমপির তথ্যের বরাত দিয়ে বলা হয়, আগের ১১ মাসে নগরীতে ছিনতাই ও ডাকাতির ৯০টি মামলা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নগরের প্রায় সব থানার এলাকাতেই ছিনতাইকারীদের উপস্থিতির অভিযোগ ছিল। অপরাধীরা এখন শুধু সিএনজি ব্যবহার করছে না। 

অনুমোদনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও দ্রুতগতির মোটরসাইকেলও তাদের ব্যবহারের তালিকায় রয়েছে। মুখে মাস্ক ও মাথায় হেলমেট থাকায় অনেক ক্ষেত্রে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রেপ্তারের পর কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলেও পুলিশের ভাষ্য রয়েছে। ছোট পর্যায়ের অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও নেপথ্যের হোতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

২০ বাস করিডরেও ছিনতাইয়ের অভিযোগ : 

জুলাইয়ে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে নগরের ২০টি বাস করিডরে ছিনতাই ও ছিনতাইচেষ্টার অভিযোগের কথা উঠে আসে। এর মধ্যে জেলগেট-লালদীঘি-কোতোয়ালি, স্টেশন রোড-নিউমার্কেট, বহদ্দারহাট-চান্দগাঁও, মুরাদপুর-জিইসি, অক্সিজেন-দুই নম্বর গেট, আগ্রাবাদ-বাদামতলী, অলংকার-ইপিজেড, রিয়াজউদ্দিন বাজার-আন্দরকিল্লা ও শাহ আমানত সেতুসংলগ্ন রুট রয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশি অভিযানও চলছে। মার্চে সিএমপির ঘোষিত ‘এস ড্রাইভে’ ৬৫ জনকে আটক করা হয়। তাদের মধ্যে ৪১ জনকে ছিনতাইকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—গ্রেপ্তার ও অভিযান সত্ত্বেও একই এলাকায় বারবার ছিনতাই হচ্ছে কেন? ভোরের কর্মজীবী মানুষ, রিকশাযাত্রী কিংবা বাসযাত্রীদের নির্দিষ্ট সড়কে নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হচ্ছে কেন? আর কেনই বা অনেক ঘটনা পুলিশের কাছে পৌঁছাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর?

সতীশ বাবু লেনের ভিডিও তাই শুধু একটি ছিনতাইয়ের দৃশ্য নয়। থানার মাত্র ১০০ মিটারের মধ্যে দিনের আলোয় পথরোধ করে ছিনিয়ে নেওয়ার এই দৃশ্য নগরীর দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সংকটকেই আবার সামনে এনেছে। ২০২৪ থেকে ধারাবাহিক ছিনতাই, অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার, কোটি টাকার স্বর্ণ লুট, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপরাধ এবং প্রাণহানির ঘটনাগুলো মিলিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে—অভিযান যতা দৃশ্যমান, ছিনতাই প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কি ততাই কার্যকর?

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  ছিনতাইকারী   দখল   চট্টগ্রাম  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close