বন বিভাগের ফরেস্ট চেক স্টেশনগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। স্টেশনগুলোতে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি বন্ধে বন বিভাগের দৃশ্যত ভূমিকা নেই। এতে দেশের চেক স্টেশনগুলো ঘুষের টোল প্লাজায় পরিণত হয়েছে। এসব টোল প্লাজার ঘুষের টাকা মাসোহারা হিসেবে পৌঁছে যাচ্ছে প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয় পর্যন্ত।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে চেক স্টেশনগুলোতে দুর্নীতি তদন্তে বিভিন্ন সময় বন অধিদপ্তরে চিঠি পাঠালেও আমলে না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বন বিভাগের বিরুদ্ধে। বন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা উপেক্ষা করা বন অধিদপ্তর নিয়মে পরিণত করেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
গত ১৬ জুলাই তথ্য অধিকার আইনে তথ্য জানতে চেয়ে আবেদন করা হয় প্রধান বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে। আবেদনে জানতে চাওয়া হয়, দেশে ফরেস্ট চেক স্টেশন সংখ্যা কত? চেক স্টেশনগুলোর নাম, কোথায় অবস্থিত এবং স্টেশনগুলোতে জনবল সংখ্যা কত? বর্তমান প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী ২০২০ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর ওই বছরের পহেলা জুন থেকে চলতি ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ফরেস্ট চেক স্টেশনগুলোতে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার দায়ে কতজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্রত্যাহার, সাময়িক বরখাস্ত এবং বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে তাদের নাম, তৎকালীন পদবি এবং বর্তমান কর্মস্থল কোথায়। তথ্য অধিকার আইনে এসব প্রশ্ন সম্বলিত আবেদনের উত্তর ৩০ কর্মদিবস পর দেন বন অধিদপ্তরের লিগ্যাল ইউনিট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপবন সংরক্ষক মাহমুদা রোকসেনা সুলতানা।
উত্তরে তিনি জানান, ‘এসব প্রশ্নের উত্তর বন অধিদপ্তরে এখনো পাওয়া যায়নি।’
চলতি বছরের ৫ জুলাই দৈনিক খোলা কাগজ পত্রিকায়, ‘ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশন ঘুষের টোল প্লাজা’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ৯ জুলাই, ‘সরকারি টাকা আত্মসাৎ করে প্রাইজ পোস্টিং’ এবং ১২ জুলাই ‘অভিযুক্তের ঘনিষ্ঠরাই কমিটির হর্তাকর্তা’ শিরোনামে সর্বমোট তিনটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনগুলোতে চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ঘুমঘাট ফরেস্ট চেকস্টেশনে বহুমুখী দুর্নীতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেও ওই চেক স্টেশনটিতে ঘুষ দিয়ে ডেপুটি রেঞ্জার মো. শামীম রেজার প্রাইজ পোস্টিংয়ের বিষয় উঠে আসে। প্রতিবেদনগুলো প্রকাশের পর চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোছাইন ঘুমঘাট স্টেশনে দুর্নীতি তদন্তের দায়িত্ব দেন সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মাহদী হাসানকে।
তদন্তের দায়িত্ব দেওয়ার এক মাস পর চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তৎকালীন বিভাগীয় বন কর্মকর্র্তা মোহাম্মদ হোছাইন বদলি হয়ে যায়। গত ৩ আগস্ট চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ থেকে সিলেট বন বিভাগে বদলির আদেশ হয় তদন্ত কর্মকর্তা মো. মাহদী হাসানের। অথচ তদন্তের নির্দেশনা পাওয়ার পর দুই মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেননি। অভিযোগ উঠেছে, ঘুমঘাট চেক স্টেশন অফিসার মো. শামীম রেজা ও ডেপুটি রেঞ্জার এসএম আনিচুর রহমান তদন্ত ধামাচাপা দিয়েছেন।
গত এক মাস আগে ধুমঘাট ফরেস্ট চেক স্টেশনে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি অনুসন্ধানের জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় থেকে বন অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের আদেশ পালনের জন্য চট্টগ্রাম অঞ্চল বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো-কে চিঠি দেয় বন অধিদপ্তর। অথচ চিঠি প্রদানের দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তদন্তের ব্যবস্থা নেননি মিহির কুমার দো।
এ ব্যাপারে জানতে চট্টগ্রাম অঞ্চল বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো’র মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সময় কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে কয়েকটি প্রশ্ন লিখে তাকে ক্ষুদেবার্তা পাঠালে তিনি দেখেও উত্তর দেননি।
অন্যদিকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রিয়াজুল ইসলাম জানান, ধুমঘাট চেক স্টেশনে দুর্নীতির সংবাদ মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্তের জন্য লিখিতভাবে বন অধিদপ্তরকে জানানো হয়েছে।
তদন্তের অগ্রগতির ব্যাপারে জানাতে তদন্ত কর্মকর্তা (এসিএফ) মাহদী হাসানের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সময় কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে তাকে ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি উত্তর দেননি।
কেকে/ এমএস