ছাত্ররাজনীতিকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দেখা দিয়েছে বড় সংঘর্ষের আশঙ্কা। গত কয়েক দিনে দেশের অন্তত ১৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত দুই শতাধিক। আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া এবং ক্যাম্পাসে বহিরাগত প্রবেশের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে, যা শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। একইসঙ্গে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
এসব ঘটনায় জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, ছাত্রদল ও শিবির সেই পুরোনো ধারার রাজনীতিতেই ফিরেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ওই সময়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গেলে হামলা ও বাধার মুখে পড়ত। তবে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বেশির ভাগ পদে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এর ফলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় ক্যাম্পাস ও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার বিরোধও প্রকাশ্যে আসছে।
তাদের মতে, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস নিয়ন্ত্রণে রাখা ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এ প্রতিযোগিতা সংঘর্ষে রূপ নিলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, এ সুযোগ বুঝে ফায়দা নিচ্ছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ। তারা সামাজিক মাধ্যমসহ নানাভাবে মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করছে। গতকাল শনিবার ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের আশঙ্কায় রাজধানীর বকশীবাজার এলাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বকশীবাজার মোড়, আলিয়া মাদ্রাসা সড়ক ও গেটের সামনে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। বিষয়টি নিশ্চিত করে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বকশীবাজার মোড়, আলিয়া মাদ্রাসার সড়ক ও গেটের সামনে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এর আগে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একটি গ্রুপ শনিবার আলিয়া মাদ্রাসায় প্রবেশের ঘোষণা দেওয়ায় সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। দ্বন্দ্ব মোকাবিলা ও নিরাপত্তায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার হল দখলকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর আলিয়া মাদ্রাসার হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয় ছাত্রদল। পরে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে হলে প্রবেশের ঘোষণা দেওয়া হলে নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে মাদ্রাসা এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
এদিকে গত সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি বাঙলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ এবং নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে এসব সংঘর্ষ ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটে। অধিকাংশ ঘটনায় উভয় সংগঠনই একে অপরকে হামলার জন্য দায়ী করেছে।
সংঘর্ষের পাশাপাশি দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ‘প্রয়োজনে ২-১টা রগ কেটে ইতিহাস তৈরি করুন’—গণবিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (গকসু) সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সামিউল হাসান শোভনের এমন একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজের ফেসবুকে পোস্টটি দেন তিনি।
পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সংসদে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের আর ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সঙ্গে শিবিরের এ কুসুম কুসুম প্রেম জাস্ট একটা ফাজলামি।’ এরপর শিবিরের উদ্দেশে তিনি ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সহিংসতার আশঙ্কা প্রকাশ করে উসকানিমূলক মন্তব্য করেন এবং ‘প্রয়োজনে ২/১টা রগ কেটে ইতিহাস তৈরি করুন’ বলে উল্লেখ করেন। সামিউল হাসান শোভন গকসু নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত প্যানেল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এর আগে ইসলামী ছাত্রশিবির সভাপতির একটি মন্তব্য ঘিরে সমালোচনা তৈরি হয়। ‘আমরা প্রতিরোধ করলে ছাত্রদল ১০ মিনিটও ক্যাম্পাসে থাকতে পারবে না’—ছাত্রশিবির সভাপতির এ বক্তব্যের একটি প্রতিবাদ বিবৃতি দেয় ছাত্রদল। এতে শিবির সভাপতির ওই বক্তব্যকে ‘শিক্ষাঙ্গনে সহিংসতার প্রকাশ্য উসকানি’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
ছাত্রশিবিরকে উদ্দেশ্য করে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, যারা ফ্যাসিবাদী শাসনের পুরো সময় আন্ডারগ্রাউন্ডে কাটিয়েছে, নিজেদের সংগঠন নিষ্ক্রিয় রেখে প্রকাশ্যে ছাত্রলীগের ছত্রচ্ছায়ায় মিশে থেকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, তাদের মুখে আজ শক্তির আস্ফালন অত্যন্ত হাস্যকর। তিনি অভিযোগ করেন, এখনো তাদের (শিবির) একটি অংশকে আন্ডারগ্রাউন্ডে রেখে অপর অংশকে সংঘাত সৃষ্টির কাজে নামানো হয়েছে, যা শিক্ষাঙ্গনকে অস্থিতিশীল করার পুরোনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকা থেকে উসকানি দিয়ে রাজশাহী, রংপুর ও চট্টগ্রামের ক্যাম্পাসগুলোতে সন্ত্রাসী মহড়া ও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে বিকৃত উল্লাস করা হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে তাদের প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে এবং এখন আর কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ছাত্রদল।
শিবির সভাপতিকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, ১০ মিনিট নয়, ১০ বছরও নয়, আপনার মতো আরও ১০-২০ জন সভাপতির মেয়াদ পূর্ণ হলেও কিছুই করতে পারবেন না।
সংঘাত নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা উল্লেখ করে ছাত্রদলের এই শীর্ষ নেতা বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল স্পষ্টভাবে বলতে চায়, আমরা সংঘাতে নয়, শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করি। কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, হুমকি কিংবা উসকানির মাধ্যমে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার যে কোনো অপচেষ্টা শিক্ষার্থীরাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করবে।
কেকে/এলএ