বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (জুলাই-জুন) বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে। পুরো অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। তৈরি পোশাক খাতের নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিই এ পতনের প্রধান কারণ। এ সময়ে পণ্য ও সেবা রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫৫ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের মোট পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম প্রায় ১৩ শতাংশ।
তবে অর্থবছরের শেষ মাস জুনে ২৫.৯১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে রপ্তানি খাত ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। একইসঙ্গে চামড়া, পাট, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশল ও কৃষিপণ্যে প্রবৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির ফলে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর নিয়ে আশা তৈরি হয়েছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত সাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৫ সালের জুনে এ আয় ছিল ৩ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে আগের বছরের একই মাসের তুলনায় আয় ২৫.৯১ শতাংশ বেশি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর আশা, জুন মাসের এই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, নতুন বাজারে সম্প্রসারণ এবং পণ্যের বৈচিত্র্যকরণের ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের রপ্তানি আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইপিবির হিসাবে, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত জুন মাসে ২১.৫২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ মাসে খাতটি থেকে আয় হয়েছে ৩ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে ১৯.৪৯ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক খাতে ২৪.০২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
সার্বিকভাবে বিদায়ী অর্থবছরে মোট রপ্তানি আয় কমার ক্ষেত্রেও তৈরি পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক ভূমিকা ছিল। আলোচিত অর্থবছরে পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পোশাক থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩৯ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার।
বিদায়ী অর্থবছরে পোশাক ছাড়াও অনেক খাতে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এর মধ্যে তামাকজাত পণ্য থেকে রপ্তানি আয় কমেছে ২১ দশমিক ৩৬ শতাংশ, চা থেকে কমেছে ১৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সিরামিক থেকে কমেছে ১৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ, হস্তশিল্প বা কারুশিল্প থেকে কমেছে ১৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ এবং পাট রপ্তানি থেকে ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ রপ্তানি আয় কমেছে।
পোশাকের বাইরে অন্যান্য রপ্তানি খাতে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জুন মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে ৪৭ দশমিক ৬৮ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্যে ৭৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৫৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ, প্রকৌশল (ইঞ্জিনিয়ারিং) পণ্যে ৪৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ এবং কৃষিপণ্যে ৪৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পুরো অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১ দশমিক ২৩ বিলিয়ন ডলার এবং পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে প্রকৌশল পণ্য খাত ২১ দশমিক ৭৭ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের হিসাবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে জাহাজ নির্মাণ শিল্প। এ খাতে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬৬৬.৩৩ শতাংশ, যা অন্যান্য সব খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ। এ ছাড়া ফলমূল রপ্তানিতে ৮৭.১৬ শতাংশ, কাঁকড়া রপ্তানিতে ৪৮.৯৮ শতাংশ, সাইকেল রপ্তানিতে ২৯.৭১ শতাংশ, ইলেকট্রিক পণ্যে ২৩.৮২ শতাংশ এবং প্রকৌশল পণ্যে ২১.৭৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
২০ দেশেই রপ্তানি ৪০ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলার :
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শীর্ষ ২০টি দেশে মোট ৪০ দশমিক ৯৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা দেশের মোট রপ্তানির বড় অংশ। বিশ্ববাজারে নানা চ্যালেঞ্জের কারণে সামগ্রিক রপ্তানি আয় সামান্য কমলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবৃদ্ধি এবং চীন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো নতুন বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান ধরে রেখেছে। আলোচ্য অর্থবছরে দেশটিতে ৯ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.০৯ শতাংশ বেশি।
ইউরোপীয় বাজারে অবশ্য মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। জার্মানিতে রপ্তানি ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ কমে ৪ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তবে যুক্তরাজ্যে ১ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং স্পেনে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। একই সময়ে পোল্যান্ডে রপ্তানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ৯.৫৮ শতাংশ বেশি।
নতুন ও উদীয়মান বাজারগুলোর মধ্যে চীনে রপ্তানি ১৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। সৌদি আরবে ১৭ দশমিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে রপ্তানি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৯.৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে রপ্তানি দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে।
অন্যদিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি কমেছে। ফ্রান্সে রপ্তানি ৯ দশমিক ২২ শতাংশ কমে ২ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এ ছাড়া ইতালিতে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ, জাপানে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ডেনমার্কে ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ রপ্তানি হ্রাস পেয়েছে। তবে কানাডায় ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
শুধু ২০২৬ সালের জুন মাসে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালের একই মাসের তুলনায় ২৫ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি। তবে মে মাসের তুলনায় জুনে রপ্তানি ৪ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমেছে।
বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক এবং ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের (জুলাই-জুন) পুরো সময়ে দেশের তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৩৯ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে খাতটিতে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তিনি বলেন, বছরওয়ারি হিসাবে ২০২৬ সালের জুন মাসে পোশাক রপ্তানি ২১ দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৩ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে নিটওয়্যার খাতে রপ্তানি বেড়ে ১ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ওভেন পোশাক খাতে রপ্তানি বেড়ে ১ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যেখানে ২৪ দশমিক ০২ শতাংশ বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
কেকে/এলএ