দেশে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিতে বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করার ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে ভোক্তাদের পছন্দের সুযোগ তৈরি এবং সরবরাহব্যবস্থা সহজ করার যুক্তিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বেসরকারি খাতকে জ্বালানি আমদানি ও সরাসরি বিক্রির সুযোগ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে বাজারে সিন্ডিকেট, মূল্য কারসাজি, ভেজাল এবং সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মতো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, দেশের প্রাথমিক জ্বালানি সংকট এককভাবে সরকারের পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন। অর্থনীতি সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে জ্বালানির চাহিদাও বাড়ছে। ফলে দীর্ঘদিনের সরকারি একচেটিয়া কাঠামোর বাইরে গিয়ে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেই বিনিয়োগের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রয়োজন। এসব নিশ্চিত না করে শুধু বেসরকারি খাতের হাতে বাজার ছেড়ে দিলে তা প্রতিযোগিতার বদলে নতুন একচেটিয়া ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ, সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় বাজারের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে। দেশের ভোজ্য তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের বাজারে বেসরকারি ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগ রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে জ্বালানির মতো কৌশলগত পণ্যে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব হবে আরও ব্যাপক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেল সাধারণ কোনো ভোগ্যপণ্য নয়। পরিবহন, শিল্প, কৃষি, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাত এর ওপর নির্ভরশীল। ফলে কোনো বেসরকারি গোষ্ঠী বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করলে তারা শুধু একটি পণ্যের দাম নয়, অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশকেও প্রভাবিত করার ক্ষমতা পেতে পারে।
সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণের যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটিও বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বাজারে একাধিক প্রতিষ্ঠান থাকলেই কার্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হয় না। বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যদি বাজারের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে নামমাত্র প্রতিযোগিতার আড়ালেও সমন্বিতভাবে দাম নির্ধারণ বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থেকে যেতে পারে।
অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হলে সংকটের সময় সরকার নিজেই বাজার নিয়ন্ত্রণে সমস্যায় পড়তে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠান আমদানি কমিয়ে দিলে, সরবরাহ বন্ধ করলে কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার অজুহাতে দাম বাড়ালে সরকারকে তখন জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি অবকাঠামো ও মজুত সক্ষমতা দুর্বল থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক ভূমিকা দুর্বল করে নয়, বরং আরও শক্তিশালী করেই বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। ভোক্তার স্বার্থ, প্রতিযোগিতা, মূল্য স্থিতিশীলতা ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নীতিমালা তৈরি না হলে সরকারের এ উদ্যোগ নতুন ধরনের বাজারঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানিকে সুবিধা দিতে নয়, যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির সুযোগ তৈরি করতে একটি সাধারণ নীতিমালা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার এখন বেসরকারি খাত থেকেও কিছু ধরনের জ্বালানি তেল কিনছে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে জ্বালানি তেলের বাজারে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। মন্ত্রী বলেন, পদ্মা, মেঘনা বা যমুনার পাম্পের পাশাপাশি কোনো বেসরকারি কোম্পানির পাম্প থাকলে ক্রেতা নিজের পছন্দ অনুযায়ী তেল কিনতে পারবেন। সরকারি ব্যবস্থায় কম দামে তেল পাওয়া গেলে কেউ সেখানে যাবেন। কেউ যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেশি দামে কিনতে চান, সেই সুযোগও থাকতে পারে।
জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগকে পরীক্ষামূলকভাবে ইতিবাচকভাবে দেখলেও এ ক্ষেত্রে ভেজাল, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে জ্বালানি তেল সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়াটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে বিস্তারিত না জেনে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা কঠিন। তবে বেসরকারি খাতকে সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগটি পরীক্ষামূলকভাবে করা যেতে পারে। এতে ভোক্তারা উপকৃত হলে ভবিষ্যতে এর পরিধি বাড়ানো সম্ভব।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গা হলো ভেজাল। একইসঙ্গে ভোক্তারা যাতে ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। শুধু সরবরাহের ক্ষেত্রে ভোগান্তি কমলেই হবে না, পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, সরকার যদি বেসরকারি খাতে জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ দিতে চায়, তাহলে প্রথমে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলকভাবে করা যেতে পারে। এতে ভোক্তারা কতটা সুবিধা পাচ্ছেন, বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে কি না এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কারণ বর্তমানে বিপিসির ওপর আগের তুলনায় অনেক বেশি দায়িত্ব রয়েছে এবং এত বড় পরিসরে সবকিছু পরিচালনা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে বেসরকারি খাতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাজারে কোনো প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী যাতে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে ভোজ্যতেলের মতো পণ্যে বেসরকারি খাতের সিন্ডিকেটের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জ্বালানি খাতেও যদি কোনো প্রতিষ্ঠান বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকার ও ভোক্তা উভয়ই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
তার মতে, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া হলেও সরকারের হাতে অন্তত ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ বা কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সরকারি নিয়ন্ত্রণ এমনভাবে রাখা যেতে পারে, যাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বা আমদানি করলেও নির্দিষ্ট অংশ ন্যায্যমূল্যে বাজারে সরবরাহ করতে বাধ্য থাকে।
ড. ইজাজ হোসেন বলেন, বেসরকারি খাতে জ্বালানি সরবরাহের উদ্যোগ ভালো না খারাপ, তা এখনই চূড়ান্তভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ, মান নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্যমূল্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে পরীক্ষামূলকভাবে উদ্যোগটি বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। ভোক্তারা সুবিধা পেলে এই ব্যবস্থাকে আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, বেসরকারি খাতের ওপর জনগণের শতভাগ আস্থা নেই। বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি খাতের কর্মকাণ্ড ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এ ধরনের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এসব দৃষ্টান্ত ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত একটি খাতে বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই জনস্বার্থ, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে। শুধু বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
এদিকে, জ্বালানি খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্যোগের ক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. উপমা কবির। তিনি বলেন, সরকার আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করেই নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত। সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং দেশের মানুষের জন্য যা সবচেয়ে উপকারী, সরকার সেই সিদ্ধান্তই নেবে বলে আশা করেন তিনি।
অধ্যাপক ড. উপমা কবির বলেন, অতীতে দেখা গেছে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর পর আবার তাদের কাছ থেকেই উচ্চ দামে জ্বালানি বা বিদ্যুৎ ক্রয় করা হয়েছে। মানে কইয়ের তেলে কই ভাজা। তাই এবার বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বেসরকারি খাতকে বড় ধরনের দায়িত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা সরকারের রয়েছে। নতুন উদ্যোগ নেওয়ার সময় অতীতের সেসব বিষয় অবশ্যই সরকারের বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কেকে/এলএ