মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৭ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: চাপে সাধারণ মানুষ, নিরুপায় সরকার      নিউইয়র্কে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      একে একে গ্রেপ্তার ইমরান খানের তিন বোন      বাসভাড়া কিলোমিটারে ২০ পয়সা বাড়াতে চান পরিবহন মালিকরা      ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৬৫৫      ইস্তাম্বুলে যাত্রাবিরতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান      হামের উপসর্গে আরও ছয় শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত ১৩০৫      
খোলাকাগজ স্পেশাল
সংবিধান সংশোধনের পথে সরকার, সংস্কার পরিষদ চায় বিরোধীরা
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৩৭ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সংবিধান সংশোধনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন সংসদে তুলে ১৮তম সংশোধনী বিল আনার পথে এগোচ্ছে সরকার। তবে সরকারের এ উদ্যোগের বিপরীতে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ‘সংস্কার পরিষদ’-এর মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের দাবি তুলেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দলও একই দাবি জানিয়েছে। 

বিশেষ কমিটির বৈঠক বর্জন করেছে কয়েকটি দল, আর রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম বৈঠকে অংশ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে গেছেন। ফলে সংবিধান পরিবর্তনের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক মতবিরোধ সামনে এসেছে। 

বৈঠকে ১৫টি দল তাদের প্রতিনিধি নিয়ে সরাসরি অংশ নেন। এবি পার্টি তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছে এবং জাতীয় গণফ্রন্টের নেতারা পারিবারিক অসুস্থতার কারণে শেষ মুহূর্তে অংশ নিতে না পারলেও টেলিফোনে সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধী দলগুলো সংসদে না থাকলেও সংবিধান সংশোধনী বিল যখন আসবে, তখন তারা সেখানে অংশ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

গতকাল রোববার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে বিশেষ কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা খুব দ্রুতগতিতে এগোতে চাই। প্রতি সপ্তাহে একটি করে বৈঠকের আয়োজন করা হবে। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ আমরা আলাপ-আলোচনা শেষ করে রিপোর্ট প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত করতে পারব বলে আশা করছি। এরপর সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিল আকারে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে আসবে। 

২৬ দলের আমন্ত্রণ, অংশ নিয়েছে ১৫

বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভায় জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী ২৬টি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানান কমিটির সভাপতি। এর মধ্যে ১৫টি দল তাদের প্রতিনিধির মাধ্যমে সরাসরি মতামত দিয়েছে। 

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এবি পার্টি তাদের লিখিত বক্তব্য দিয়েছে। জাতীয় গণফ্রন্টের নেতারা পারিবারিক অসুস্থতার কারণে শেষ মুহূর্তে সভায় উপস্থিত হতে না পারলেও টেলিফোনে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি কমিটির বৈঠকে অংশ নেয়নি।

কমিটির কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বিদ্যমান শাসনব্যবস্থা, নির্বাচন, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। এসব সংস্কারের প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পরিবর্তন নিয়ে কমিটি কাজ করবে।

বদলাতে পারে অর্থবছর

সংবিধানের কাঠামোগত পরিবর্তনের আলোচনায় অর্থবছর পরিবর্তনের বিষয়টিও উঠে এসেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমানে জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত অর্থবছর থাকলেও তা পরিবর্তন করে ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ করার সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সুচারুরূপে বাস্তবায়ন এবং অপচয় কমানোর লক্ষ্যেই অর্থবছরের সময় পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ পরিবর্তন কার্যকর করতে সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।

১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষের প্রস্তাব

দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়েও কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ১০০ সদস্য নিয়ে একটি উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে অনেক রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমদ।

তবে প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিভিন্ন দল যে হারে আসন পাবে, তার আনুপাতিক ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। উচ্চকক্ষের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা থাকবে না বলেও জানান তিনি।

‘নোট অব ডিসেন্ট’ নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা

জুলাই জাতীয় সনদে কয়েকটি দলের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের প্রসঙ্গেও কথা বলেন কমিটির সভাপতি। তিনি বলেন, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্নমত জানিয়েছিল, তার অনেকই নির্বাচনি ইশতেহারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ম্যান্ডেট নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেট ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই এসব বিষয় বাস্তবায়ন করা হবে।

সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে পরিবর্তন চায় না—এমন প্রচারণা সম্পূর্ণ অসত্য দাবি করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ যেভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে, সরকার সেভাবেই তা বাস্তবায়ন করবে।

সংবিধান সংশোধনের পর ভবিষ্যতে আদালতে তা চ্যালেঞ্জ বা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান কোনো সর্বকালের জন্য অপরিবর্তনীয় গ্রন্থ নয়। সমাজের প্রয়োজন ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন দেশে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়।

তিনি বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করে এবং সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে জনগণের চাহিদা অনুযায়ী সংবিধানের যে কোনো বিধান পরিবর্তন করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহুবার সংবিধান সংশোধনের নজির রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিরোধী দলগুলো বর্তমানে সংসদে না থাকলেও সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপিত হলে তারা আলোচনায় অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

‘সংবিধান সংশোধন নয়, সংস্কার চাই’

সরকারের এ উদ্যোগের বিপরীতে সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটিতে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি দেওয়া হবে না। জুলাই জাতীয় সনদে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কার বাস্তবায়নের একটি প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়েছিল। এখন সেই প্রক্রিয়া থেকে সরে গিয়ে শুধু সংসদীয় সংশোধনের পথে যাওয়া উচিত নয়।

গোলাম পরওয়ারের দাবি, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাবের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের গেজেট অনুযায়ী বৈধ ভোটের ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার বক্তব্য, ওই গণভোটে জনগণ শুধু কয়েকটি সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়ে মত দেয়নি, বরং সংস্কার বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াতেও সম্মতি দিয়েছে।

বৈঠক বর্জন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের

বিশেষ কমিটির বৈঠকে অংশ নিয়েও প্রতিবাদ জানিয়ে বেরিয়ে যান রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম। তিনি বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো বিষয় সাধারণ সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে আদালতে তা চ্যালেঞ্জের সুযোগ থাকে। জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংবিধানে মৌলিক পরিবর্তন আনতে হলে সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন।

তার দাবি, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কোনো ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট ছিল না। কিন্তু সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করেছে।

কমিটির সদস্যরা সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়ে এখনো ঐকমত্য হয়নি বলে জানিয়েছেন উল্লেখ করে হাসনাত কাইয়ুম বলেন, এ বিষয়ে আরও আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা তারা জানিয়েছেন।
বৈঠকে অংশ নেয়নি ইসলামী আন্দোলন

জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে সংবিধান সংস্কার করতে হবে জানিয়ে বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণভোটের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংবিধান সংশোধনের কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সমীচীন নয়। তাই তারা কমিটির সভায় অংশ নেয়নি।

দলটির সহকারী মহাসচিব ও প্রচার বিভাগের প্রধান শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, গণভোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সরকারের পছন্দ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ইসলামী আন্দোলন অংশ নেবে না।
খেলাফত মজলিসেরও আপত্তি

সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির মতবিনিময় সভা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে খেলাফত মজলিসও। রোববার পুরানা পল্টনে আয়োজিত জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে দলটির মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের বলেন, গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাই জাতীয় সনদের ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। সেই রায় অনুযায়ী নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তার অভিযোগ, সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করে সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পরিবর্তে সীমিত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে।

কেকে/ এমএস


আরও সংবাদ   বিষয়:  সংবিধান সংশোধন   সংস্কার পরিষদ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close