আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় দেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন দামে ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন, শিল্প, উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল রোববার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে— আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়, বিপিসির লোকসান কমানো এবং জ্বালানি তেল পাচার ঠেকাতেই এ মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। তবে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে সে অনুযায়ী কমানোর নজির না থাকলেও বাড়ার ক্ষেত্রে দ্রুত মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। ফলে হঠাৎ করে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত যৌক্তিক নয় বলে মনে করছে সংগঠনটি।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও জনস্বার্থে গত পাঁচ মাস দেশে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ ২০২৬ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ পরিস্থিতি এখনো অব্যাহত রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেলেও জনস্বার্থে দেশে সে অনুযায়ী মূল্য বাড়ানো হয়নি। ফলে মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, গত ১৮ এপ্রিল দেশে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও গত পাঁচ মাস দেশে দাম অপরিবর্তিত ছিল।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি জ্বালানি পণ্যের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বেড়েছে।
জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে আরও জানায়, বর্তমানে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের তুলনায় জ্বালানি তেলের দাম অনেক বেশি। ভারতে (কলকাতা) প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৪ টাকা ৭৬ পয়সা, মিয়ানমারে ১৬৪ টাকা ৮৩ পয়সা, নেপালে ১৬১ টাকা ২৪ পয়সা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯ টাকা ৪২ পয়সা, থাইল্যান্ডে ১৫১ টাকা ২২ পয়সা এবং ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা।
এ ছাড়া মালদ্বীপে ১৪০ টাকা ৭১ পয়সা, ফিলিপাইনে ১৬৮ টাকা ৫৩ পয়সা, পাকিস্তানে ১৮৫ টাকা ৪৮ পয়সা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১৪৪ টাকা ৭৯ পয়সা দরে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার।
সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম থাকায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানি করা জ্বালানি তেল পাচার রোধে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী ডিজেলে বিপিসির লিটারপ্রতি লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা। এ হিসাবে শুধু ডিজেলেই দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা। একই হারে লোকসান অব্যাহত থাকলে বছরে ডিজেলে বিপিসির প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসান হতে পারে।
সরকার বলছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমানো সম্ভব হবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এলএনজি খাতেও সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ সচল রাখা, সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চলমান রাখা, বিপিসির লোকসান কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি এড়ানোর লক্ষ্যেই নতুন করে দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের দাবি করছে সরকার। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দেশে সে অনুযায়ী জ্বালানি তেলের দাম কমানোর নজির নেই। বরং দাম বাড়ার সময় দ্রুত সমন্বয় করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার প্রভাব দেশে আসতে কিছুটা সময় লাগে। ফলে হঠাৎ করে রাতারাতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বর্তমান মূল্যবৃদ্ধি অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন তিনি।
এস এম নাজের হোসাইন বলেন, জ্বালানি তেল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পণ্য। এর দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খাত নয়, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, পণ্য পরিবহন ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব প্রায় সব খাতেই পড়বে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার পেছনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্তও একটি কারণ হতে পারে। আইএমএফের ঋণ পেতে সরকারকে যেসব শর্ত পূরণ করতে হচ্ছে, তার মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এভাবে শর্ত পূরণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব কতটা পড়বে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
কেকে/ এমএস