একসময় পরিবারের পরিধি ছিল অনেক বড়। একই ছাদের নিচে থাকতেন দাদা-দাদি, চাচা-ফুফু, ভাইবোনসহ পরিবারের একাধিক সদস্য। শিশুদের বেড়ে ওঠার সময় তাদের চারপাশে থাকত অনেক মানুষ। গল্প শোনা, খেলাধুলা, পারিবারিক আড্ডা, বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে জীবন সম্পর্কে শেখা—সবকিছুই ছিল শৈশবের স্বাভাবিক অংশ। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র।
নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, আবাসন সংকট, ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবারের বদলে বাড়ছে ছোট পরিবার। বাবা-মা ও এক বা দুই সন্তান— এটাই এখন অনেক পরিবারের স্বাভাবিক কাঠামো। ফলে অনেক শিশুর শৈশব এখন কাটছে চার দেয়ালের মধ্যে, মোবাইল ফোন ও অনলাইন গেমের পর্দায়। মাঠের খেলাধুলা, পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে সময় কাটানো ও সমবয়সি শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলার সুযোগও কমে যাচ্ছে।
বিশেষ করে শহরকেন্দ্রিক এমন পরিবারের সংখ্যা অনেক বেশি। বাবা-মা দুজনই চাকরি করেন— এমন পরিবারের সংখ্যাও কম নয়। যার ফলে কর্মব্যস্ততার কারণে সন্তানকে সময় দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না অনেক অভিভাবক। স্কুল, কোচিং, প্রাইভেট টিউটর, অনলাইন ক্লাস ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের মধ্যে আটকে যাচ্ছে শিশুর দৈনন্দিন জীবন। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে— বাড়িতে মানুষ থাকলেও কথা বলার মতো মানুষ নেই। একদিকে বাবা-মা ব্যস্ত। অন্যদিকে পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যদের অনুপস্থিতিও তৈরি করছে সামাজিক শূন্যতা।
প্রবীণ নাগরিকদের অনেকেই মনে করেন, পরিবার ছোট হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পারিবারিক সময়ের ব্যবহারে। রাজধানী বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা ওয়ালিয়ার রহমান খোলা কাগজকে বলেন, আগে একটি বাড়িতে অনেক মানুষ থাকত। শিশুরা কারও না কারও সঙ্গে কথা বলত, খেলত, গল্প শুনত। বকা খেলে অন্য কারও কাছে গিয়ে আদর পেত। এখন অনেক শিশুই মা-বাবা দুজনকে নিয়েই বড় হচ্ছে। মা-বাবা কর্মব্যস্ত থাকলে শিশুর সঙ্গী হয়ে যাচ্ছে মোবাইল ফোন।
তিনি আরও বলেন, আমরা চাই না পুরোনো দিনের সবকিছু ফিরে আসুক। কিন্তু পরিবারের মধ্যে যে আন্তরিকতা ও সময় দেওয়ার সংস্কৃতি ছিল, সেটি যেন হারিয়ে না যায়।
আওলাদ হোসেন নামে অন্য একজন খোলা কাগজকে বলেন, আমাদের সময়ে খেলতে যাওয়ার জন্য কাউকে ডাকতে হতো না। বিকেল হলেই সবাই মাঠে চলে যেত। এখন শিশুরা একই ঘরে বসে থেকেও একে অন্যের সঙ্গে কথা বলে না। হাতে থাকে মোবাইল। আর পরিবারের বড়রা যদি সময় না দেন, তাহলে শিশুরা নিজের মতো করে জগৎ তৈরি করে নেয়।
এদিকে বিশেষজ্ঞরাও বলছেন— শিশুর অবসর মানেই মাঠে ছুটে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, বিকেলে পাড়ার গলিতে আড্ডা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। এখন সেই জায়গা অনেকাংশে দখল করেছে স্মার্টফোন, অনলাইন গেম, ভিডিও কনটেন্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এতে প্রযুক্তি শিশুর শিক্ষার সুযোগ বাড়িয়েছে, যোগাযোগ সহজ করেছে এবং বিনোদনের নতুন দরজা খুলেছে। কিন্তু প্রযুক্তির অতিরিক্ত নির্ভরতায় উদ্বেগও তৈরি করছে। তারা মনে করেন, শিশুদের ভুল সঙ্গ, অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট ব্যবহার, ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট এবং সামাজিক চাপ—সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে কথা হলে শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. খান শরীফুজ্জামান খোলা কাগজকে বলেন, ‘আমরা জানি, রাষ্ট্র হলো পরিবারের একটি বৃহত্তর সংস্করণ। ফলে পরিবারের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্য রাষ্ট্রের চরিত্রে প্রতিফলিত হবে। আবার একইসঙ্গে রাষ্ট্রের প্রধান উপাদান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবারকে গড়ে তুলতে এবং পরিবারের পাশাপাশি সামগ্রিক সামাজিক মূল্যবোধ নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।’
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আজ থেকে ২০০ বা ২৫০ বছর আগে, যখন বাংলায় সুলতানি ও মোগল আমল ছিল, যে সময়কে বাংলার ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলা হয়। তখন আমরা কিশোর অপরাধের মতো শব্দ শুনিনি। এমনকি পাকিস্তান আমলেও এ ধরনের ঘটনা ছিল না। এর পেছনে তৎকালীন পরিবার ও সমাজে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সমাজ ও পরিবারে এক ধরনের ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা ছিল। বর্তমানে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের কিছুটা ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধারণের সঙ্গে সঙ্গে সেই মূল্যবোধের চর্চায় পরিবর্তন এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার মূল বক্তব্য হলো মূল্যবোধের চর্চা। আর এ মূল্যবোধ সবচেয়ে কার্যকরভাবে গড়ে তোলা যায় ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় শিক্ষার চর্চার মাধ্যমে। শুধু শিশু-কিশোরদের মধ্যেই নয়, বড়দের মধ্যেও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটেছে। নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের চর্চা থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে সমাজে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।’
একক পরিবারের প্রসঙ্গে ড. খান শরীফুজ্জামান বলেন, অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে একক পরিবারে বসবাস করেন। তবে প্রবীণ মা-বাবাকে সঙ্গে না রাখার প্রবণতাও একটি ভয়াবহ বিষয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, ছেলে বা মেয়ের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা মা-বাবাকে সঙ্গে রাখছেন না। অথচ একজন রিকশাচালকও অনেক সময় তার মা-বাবাকে সঙ্গে রাখেন। অন্যদিকে, একজন চাকরিজীবী সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে রাখছেন না। আগে মানুষের মধ্যে মুরুব্বিদের সঙ্গে রাখা, তাদের দেখাশোনা করা এবং দায়িত্ব নেওয়ার যে মূল্যবোধ ছিল, সেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’
তার মতে, পারিবারিক দায়িত্ববোধের এ ঘাটতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রয়েছে। ‘আজ আমি যদি আমার মা-বাবার দেখাশোনা না করি, তাহলে ভবিষ্যতে আমার সন্তানও আমার প্রতি একই ধরনের আচরণ করতে পারে। পরিবারে দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক যত্নের চর্চা না থাকলে এ চক্র চলতেই থাকবে’ যোগ করেন তিনি।
কেকে/ এমএস