মাস কয়েক আগে শেষ হয়েছে জাতীয় নির্বাচন। সেই আমেজ কাটতে না কাটতেই সারা দেশের মতো বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলা ও পৌরসভায় বইতে শুরু করেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের হাওয়া। ইতোমধ্যে নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী। পুরো জনপদ এখন উৎসবের আমেজে ভাসলেও পর্দার আড়ালে বইছে এক ভিন্নধর্মী সমীকরণ।
চায়ের দোকান থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সবখানেই এখন একটাই আলোচনা, বিগত তিন দশকের চেনা ছকে এবার আর ভোট হচ্ছে না গৌরনদীতে। ২০২৬ সালের এই স্থানীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী। আর এই নতুন হাওয়ায় ভোটারদের নজর কাড়তে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
অন্যদিকে, ভোটের মাঠে নীরবে ফিরতে মরিয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে গৌরনদী উপজেলা। বিএনপির ঘরে ঘরে প্রতিযোগিতা। জনপ্রতিনিধি হয়ে জনগণের সেবক হওয়ার ইচ্ছা থেকে উপজেলা চেয়ারম্যান, মেয়র, ভাইস চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর এবং মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে উন্মুখ একঝাঁক নেতা। গৌরনদী পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ড এবং উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মোট ৬৩টি ওয়ার্ডজুড়েই এখন সম্ভাব্য প্রার্থীদের পোস্টার, ফেস্টুন ও বিলবোর্ডের ছড়াছড়ি। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রার্থীরা নানা রঙের ব্যানার টাঙিয়ে দোয়া ও সমর্থন চাচ্ছেন।
সবচেয়ে বেশি তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে বিএনপির নেতাদের মধ্যে। দলটির হাইকমান্ড থেকে এখনো কাউকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত না করায় প্রতিটি স্তরেই বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে নেমেছেন। দলীয় সমর্থন বা প্রতীক পাওয়ার আশায় নেতাদের মধ্যে চলছে এক তীব্র অথচ সুস্থ নীরব প্রতিযোগিতা। করোনাকালীন ও পরবর্তী সময়ে জনগণের পাশে থাকার খতিয়ান তুলে ধরে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন তারা।
এদিকে, বেশ সুসংগঠিত কৌশলে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ইতোমধ্যে তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। দলের এই আগাম ও সুসংগঠিত প্রস্তুতি স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা এখনো প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। তাদের অনেকেই মামলার কারণে এলাকাছাড়া কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিতে রয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যে না থাকলেও ‘নির্বাচনী মাঠের হাল ছাড়েননি’। দলটির মেম্বার ও কাউন্সিলর পদপ্রার্থীসহ অনেক প্রভাবশালী নেতাই ভেতরে-ভেতরে ভোটারদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। নীরবে, কৌশলী উপায়ে তারা নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের সচল রাখছেন এবং ভোটের মাঠে চমক দেখানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
গৌরনদীর মাঠপর্যায়ের ভোটার, প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তরুণদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৩০ বছরে গৌরনদীর নির্বাচন মূলত একটি নির্দিষ্ট বলয়ের আধিপত্যে বন্দি ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা জানান, বিগত তিন দশকে যে ধরনের একমুখী বা প্রভাবাধীন নির্বাচন দেখেছে গৌরনদীবাসী, এবার পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ভোটারদের মধ্যে সচেতনতা এখন তুঙ্গে। কোনো দলীয় প্রভাব বা পেশিশক্তির কাছে মাথা নত না করে প্রার্থীরা যেভাবে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন, তা গত ৩০ বছরে দেখা যায়নি।
এবারের নির্বাচনের আরেকটি বড় ফ্যাক্টর প্রবাসী ভোটাররা। গৌরনদীর একটি বড় অংশ প্রবাসী, যারা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকায় বসে প্রযুক্তির কল্যাণে সার্বক্ষণিক নজর রাখছেন নিজের এলাকার ওপর। এই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা সরাসরি ভোট দিতে না পারলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিফোনে দেশের মাটিতে থাকা তাদের পরিবারের বিশাল ভোটব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করছেন। কার বাক্সে ভোট পড়বে, তা নির্ধারণে পর্দার আড়াল থেকে বড় ভূমিকা রাখছেন এই প্রবাসীরা।
সব মিলিয়ে, তিন যুগের চেনা ছক ভেঙে গৌরনদী উপজেলা ও পৌরসভায় এবার এক ঐতিহাসিক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন সাধারণ ভোটাররা।
কেকে/ এমএস