দেশে গ্রীষ্মকালে তরমুজের চাষ হলেও ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে মৌলভীবাজার জেলায়। এ জেলার জুড়ী উপজেলায় অসময়ে তরমুজ চাষ করে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন স্থানীয় দুই কৃষক। বর্ষাকালেও তরমুজ চাষে ব্যাপক সাফল্য পেয়ে উৎপাদন ব্যয়ের দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ লাভের স্বপ্ন বুনছেন চাষি সিরাজুল ইসলাম ও সাইদুল ইসলাম।
উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের ডোমাবাড়ী গ্রামের দুই কৃষকের ক্ষেতে এখন তরমুজের সবুজ লতা, মাচাংয়ের নিচে ঝুলছে ডোরাকাটা পরিপক্ব ফল। এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন আশপাশের এলাকার কৃষক ও দর্শনার্থীরা।
তরমুজ চাষিরা জানান, একসময় মে মাস পেরোলেই বিদায় নিতো রসালো তরমুজ। কিন্তু দিন বদলেছে এবং বদলেছে তরমুজের মৌসুম আর চাষাবাদের ধরন।
সরেজমিনে দেখা যায়, মাটি থেকে অল্প উঁচু মাচায় সূর্যডিম এবং ল্যানফে জাতের ঝুলন্ত তরমুজে ভরে গেছে ক্ষেত। অসময়ের তরমুজ কৃষকের মুখে ফুটিয়েছে চওড়া হাসি। কারণ বাজারে এখন তরমুজ সরবরাহ কম থাকলেও ক্রেতার চাহিদা রয়েছে তুঙ্গে। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়েই ভরা মৌসুমের তুলনায় দিগুণ বেশি দামে তরমুজ বিক্রির আশা করছেন এ দুই কৃষক। প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী রঙের ও উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন তরমুজ উৎপাদন করে তারা স্থানীয় কৃষকদের মাঝেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, মাচা পদ্ধতিতে বারোমাসি তরমুজ চাষ বিবেচিত হচ্ছে সম্ভাবনাময় একটি কৃষিপণ্য হিসাবে। মাচাং পদ্ধতিতে চাষ করা এসব তরমুজের ফলন যেমন বেশি, তেমনি রোগবালাইও তুলনামূলক কম। একটি শেড তৈরি হলে সেই শেডে ন্যূনতম তিনবার তরমুজের আবাদ করা যায়। শেড নির্মাণ খরচটি পরের দুবার হয় না। ফলে পরের দুবার উৎপাদন খরচ কমে গিয়ে লাভ আরও বেশি হয়।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, দুই কৃষকের ক্ষেতে রয়েছে বীজ পাতা কোম্পানির সূর্যডিম এবং লালতীর কোম্পানির ল্যানফে জাতের তরমুজ। আকর্ষণীয় রঙ, উন্নত মান ও সুস্বাদের কারণে এ দুটি জাতের বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ফলে উৎপাদিত তরমুজ সহজেই বাজারজাত করা যাচ্ছে এবং ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে।
কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা কৃষি অফিসের কারিগরি সহযোগিতায় প্রায় ২০ শতক জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ করেছি। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছুটা ক্ষতি হলেও ফলন আশাব্যঞ্জক হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ফলন আরও ভালো হতো। এবার সফলতা পাওয়ায় আগামীতে আরও বড় পরিসরে তরমুজ চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।’
আরেক তরমুজ চাষি সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘নতুন পদ্ধতিতে চাষ শুরু করার সময় কিছুটা শঙ্কা ছিল। তবে কৃষি বিভাগের পরামর্শ মেনে কাজ করায় ভালো ফলন পেয়েছি। আশা করছি এখান থেকে লাভবান হতে পারবো।’
স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা জানি তরমুজ চাষ হয়ে থাকে গ্রীষ্মকালে। কিন্তু আমাদের জুড়ী উপজলায় বর্ষাকালে তরমুজর চাষের খবর শুনে করা তরমুজের খেত দেখতে এসেছি। একইসঙ্গে পরামর্শ নিতে আসছি। আমিও আগামীতে বর্ষাকালীন তরমুজ চাষ করবো।’
স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, তরমুজ চাষ শুধু ব্যক্তিগত লাভ নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রাণ ফিরিয়ে আনছে। কৃষি বিভাগও আশা করছে এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জুড়ী উপজেলাই হতে পারে দেশের বর্ষা ও শরৎকালীন তরমুজ চাষের অন্যতম সফল অঞ্চল।
জুড়ী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রনি সিং বলেন, ‘মাচা পদ্ধতিতে অসময়ের তরমুজ চাষ এ এলাকায় একটি নতুন উদ্যোগ। কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও মাঠ পর্যায়ে তদারকির মাধ্যমে এ সফলতা এসেছে। এটি দেখে অন্যান্য কৃষকরাও নতুন প্রযুক্তিনির্ভর চাষে উৎসাহিত হবেন।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান বলেন, ‘অসময়ের মাচা পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ এখন কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বর্ষা ও শরৎকালেও মালচিং ও মাচাং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করা সম্ভব। এ জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। কৃষকরা যাতে আরও উৎসাহ পায় সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি।’
কেকে/এআই