সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: পাহাড়ের বুকে জীবনবাজি বর্ষা এলেই ধসের ভয়       খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরেছেন স্পিকার      কমলাপুর পর্যন্ত চালু হচ্ছে মেট্রোরেল      সরকারি ক্রয় কমিটি পুনর্গঠন      পুলিশের ৩৩ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর      পুলিশের ৬ ডিআইজিকে বদলি, নতুন দায়িত্বে পদায়ন      জনগণের ভালোবাসার ওপরই নির্ভর করতে চাই: প্রধানমন্ত্রী      
খোলাকাগজ স্পেশাল
পাহাড়ের বুকে জীবনবাজি বর্ষা এলেই ধসের ভয়
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:০৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

বর্ষা মানেই পাহাড়ধসের শঙ্কা। শুধু আশঙ্কাই নয়—প্রতিবছরই পাহাড়ধসে বহু প্রাণহানিও ঘটে। তারপরও বন্ধ করা যায়নি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকি নিয়ে মানুষের বসবাস। যদিও বর্ষা এলেই এখানে বসবাসরত মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বেড়ে যায়, তবুও মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সেই পাহাড়েই নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে হাজার হাজার পরিবার।

২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে রাঙামাটির শিমুলতলীতে কমপক্ষে ১২০ জন নিহত হন। ছোট-বড় আরও দুর্ঘটনাও ঘটে। তারপরও এখানকার বাসিন্দারা চালিয়ে যাচ্ছেন বেঁচে থাকার সংগ্রাম। দুর্ঘটনার আগে-পরে প্রশাসন থেকে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাসিন্দাদের পুনর্বাসন করা হয় না। ফলে প্রতিবছর বর্ষা এলে পাহাড়ধসের শঙ্কা নিয়েই বসবাস করেন এখানকার বাসিন্দারা।

এমন অবস্থার মধ্যে গতকালও ৭২ ঘণ্টায় ঢাকাসহ দেশের ছয় বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল রোববার দুপুরে ৭২ ঘণ্টার সতর্কবার্তায় বলা হয়, রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি হতে পারে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো বিস্তারিত খবর—

রাঙামাটিতে পাহাড়ের ঝুঁকিতে ২০ হাজার মানুষের বসবাস : ২০১৭ সালের ভয়াবহ পাহাড়ধসে রাঙামাটি শহরের প্রবেশমুখ শিমুলতলী এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে ১২০ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক মানুষ। মাটির সঙ্গে মিশে যায় অসংখ্য ঘরবাড়ি। সেই ঘটনার ৯ বছর পরও টনক নড়েনি স্থানীয়দের। ব্যাপক প্রাণহানির পরও পুনরায় একই স্থানে গড়ে তোলা হয় ঘরবাড়ি। মৃত্যুঝুঁকি জেনেও এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। শুধু শিমুলতলী এলাকায় নয়; রাঙামাটি পৌর এলাকার ভেদভেদী, যুব উন্নয়ন এলাকা, মনতলা আদাম, সাপছড়ি, পোস্ট অফিস এলাকা, মুসলিম পাড়া, নতুন পাড়া, মোনঘর, সনাতন পাড়া এলাকার চিত্র একই। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, রাঙামাটিতে বর্তমানে ১২৬টি এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ছয় হাজার পরিবারের ২০ হাজার মানুষ পাহাড়ের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। এ ছাড়া বর্ষার আগে এসব এলাকায় প্রশাসন সাইনবোর্ড দিয়ে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ভারী বৃষ্টি হলেই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে তোড়জোড় শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন। বৃষ্টি শেষ হলে আবারও আগের অবস্থায় ফিরে আসে সবকিছু। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের নিয়ে স্থায়ী কোনো পরিকল্পনা না নেওয়ায় সমস্যা দীর্ঘতর হচ্ছে বলে স্থানীয়দের জানান।

শিমুলতলী এলাকার বাসিন্দা মো. সাব্বির আলী বলেন, শহরে থাকতে গেলে অনেক টাকায় ঘরবাড়ি ভাড়া দিতে হয়। আমাদের ইনকাম কম। বাধ্য হয়ে এখানে অল্প টাকা দিয়ে একটা জায়গা কিনে পরিবার নিয়ে থাকি। সনাতন পাড়ার বাসিন্দা সুমন চৌধুরী বলেন, বৃষ্টি হলে ভয় হয়। তবুও কোথাও যেতে পারি না। বর্ষাকাল ছাড়া আমরা এখানে আরামেই আছি। রূপনগর এলাকার খোকন ও হামিদা পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে ঘর নির্মাণ করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। তারা জানান, অন্যত্র যাওয়ার জায়গা না থাকায় মৃত্যু শঙ্কা আছে জেনেও সেখানে রয়েছেন। খোকন বলেন, সরকার আমাদের জায়গা ছাড়তে বলে। আমরা কোথায় যাব, থাকব কোথায়, সেই বিষয়ে কিছুই বলে না। আমরা কোথায় যাব?

পরিবেশবাদী সংগঠন গ্লোবাল ভিলেজের পরিচালক হেফাজত সবুজ বলেন, ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে অনেক প্রাণহানির পর তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রশাসন। সেই কমিটির রিপোর্ট এবং সুপারিশ আমরা আজও জানতে পারিনি। বর্তমান পাহাড়ের চিত্রই বলে দেয়, সেই রিপোর্টের সুপারিশ অনুসরণ করা হয়নি। যদি অনুসরণ করা হতো, তাহলে এত বড় একটি ঘটনার পর পুনরায় একই স্থানে বসতি স্থাপন হতো না। সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হতো না।

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, পাহাড়ের পাদদেশে যারা বসবাস করেন, তাদের অনেকেই অবৈধ দখলদার। পাহাড়ে ভূমি বন্দোবস্ত বন্ধ থাকায় তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনেও সমস্যা হচ্ছে। তারপরও প্রশাসন থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হলে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, রাঙামাটিতে ২০১৭ সালের ১৩ জুন পাহাড়ধসে পাঁচ সেনাসদস্যসহ ১২০ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৮ সালের জুনে জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় ফের পাহাড়ধসে দুই শিশুসহ ১১ জন এবং ২০১৯ সালের জুনে জেলার কাপ্তাইয়ে তিনজনের প্রাণহানি ঘটে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত প্রশাসন : খাগড়াছড়িতে টানা ভারী বর্ষণে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বা ঘটনা প্রায়ই ঘটে। বর্ষা মৌসুমে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে সতর্কতামূলক মাইকিংসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ করে জেলার শালবন, কলাবাগান, সবুজবাগ, মাটিরাঙ্গা, ভূয়াছড়ি এবং মহালছড়ির ধুমনীঘাট এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে থাকে। যার ফলে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। চলতি বছর বর্ষার শুরুতেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। এলাকায় সতর্কতামূলক মাইকিংসহ সেমিনার, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমে সতর্ক করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে।

খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদাত জানান, এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেনি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হয়েছে। যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে তা মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।

বান্দরবানে পাহাড় কেটে বসতি, বর্ষা এলেই বাড়ে ঝুঁকি : বান্দরবানে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাস করছে হাজারো পরিবার। সমতল ভূমির অপ্রতুলতার কারণে দিন দিন অসহায় পরিবারগুলো মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানের মাটি কেটে তৈরি করছে বসতবাড়ি। শুষ্ক মৌসুমে কোনো সমস্যা না হলেও বর্ষা মৌসুম শুরু হলে দেখা দেয় পাহাড়ধস। এতে ঘটে প্রাণহানি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বর্ষা মৌসুমে প্রাণহানি এড়াতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার ইসলামপুর, লাঙ্গিপাড়া, হাফেজঘোনা, কালাঘাটা, বনরুপা পাড়া, সিদ্দিকনগর, ক্যাচিংঘাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ পরিবার পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। দিন দিন বাড়ছে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে বসতঘর নির্মাণ। রুমা, লামা, আলীকদম, থানচি, নাইক্ষ্যংছড়ি এবং রোয়াংছড়ি উপজেলায় পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করায় বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় পাহাড়ধসে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।

বান্দরবানের কালাঘাটার বাসিন্দা মো. মঈন উদ্দিন বলেন, বর্ষা আসলে পাহাড়ে চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। কেউ কেউ অবৈধভাবে পাহাড় কাটে, আবার কেউ কেউ সেই মাটি নিয়ে ব্যবসা শুরু করে।

বান্দরবানের ইসলামপুরের বাসিন্দা মো. আসিফ বলেন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানকে রক্ষা করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। পাহাড়ের চূড়ায় বসবাসরত গরিব ও অসহায়দের প্রতি প্রশাসনের নজরদারি বৃদ্ধি করতে হবে। বর্ষা মৌসুমে মাইকিং করে তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে সাময়িক আশ্রয় দিয়ে কাজ শেষ করলে হবে না, তাদের স্থায়ী পুনর্বাসনের দিকেও প্রশাসনের নজর দেওয়া সময়ের দাবি।

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বান্দরবান পার্বত্য জেলার সাত উপজেলায় ৫ হাজার ৭৫৬টি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাস করছে। বেসরকারি হিসেবে যা কয়েক গুণ বেশি। প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা এলে কিছু ব্যক্তি পাহাড় কাটে। এতে দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনা ঘটে। তবে যারা অবৈধভাবে পাহাড় কাটছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বান্দরবান পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক জানান, বর্ষা এলে অনেকেই বান্দরবানে পাহাড় কাটে, কারণ বর্ষায় পাহাড়ের মাটি নরম হয় আর বৃষ্টির মধ্যে সহজেই পাহাড় কর্তন করা যায়। পৌরসভার প্রশাসক এস এম মনজুরুল হক আরও জানান, যারা অবৈধভাবে পাহাড় কাটে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরও জানান, পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের স্থায়ী পুনর্বাসনের পরিকল্পনা বা বরাদ্দ নেই। সরকার কোনো পরিকল্পনা নিলে পৌরসভার পক্ষ থেকে আমরা সার্বিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

কেকে/এলএ


আরও সংবাদ   বিষয়:  পাহাড় ধস   শঙ্কায়  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close