ঠাকুরগাঁওয়ের তৃণমূলের রাজনীতি থেকে দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেরিয়ে এবার বঙ্গভবনের পথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সবচেয়ে দুঃসময়ে দলের কাণ্ডারি। রাজপথের আন্দোলন থেকে আদালতের বারান্দা, কারাগার থেকে সংবাদ সম্মেলনের মঞ্চ, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রায় প্রতিটি বাঁকে বিএনপির হয়ে থেকেছেন সামনে। কখনো দলের মহাসচিব হিসেবে, কখনো আন্দোলনের মুখ হিসেবে, আবার কখনো সংকটে থাকা দলের ভার সামলানো এক নীরব সংগঠক হিসেবে।
বৃহস্পতিবার (১৪ আগস্ট) বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর তাকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিন তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। যার অংশ হিসেবে দলের মহাসচিব এবং সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। একই সঙ্গে পদত্যাগ করেন স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর পদ থেকে। সব ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হবেন তিনি।
দেশের উত্তরাঞ্চলের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম হলেও তার জাতীয় পরিচয় তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক পথচলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষকতা, জিয়াউর রহমানের সময়ের প্রশাসনের কর্মকর্তা, ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র, জেলা বিএনপির সভাপতি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভা, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং শেষ পর্যন্ত বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এই দীর্ঘ পথের প্রতিটি ধাপই তাকে নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
এবার দলীয় রাজনীতির ময়দান থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হবেন তিনি। রাষ্ট্রপতি পদটি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। সেখানে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা এবং সব নাগরিকের প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন বিএনপির মুখ হিসেবে রাজনীতি করা একজন নেতা রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলে দলীয় পরিচয়কে অতিক্রম করে রাষ্ট্রের প্রতীকী অভিভাবকের ভূমিকায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বলে মনে করছেন অনেকেই।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু : মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলা শুরু বিএনপির জন্মের বহু আগে। ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির ছাত্র থাকা অবস্থায় ষাটের দশকের শেষ দিকে ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নেতৃত্বে ছিলেন।
তখনকার রাজনৈতিক বাস্তবতায় ছাত্র ইউনিয়ন ছিল বামপন্থী রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে ছাত্ররাজনীতিতে তার সক্রিয়তা পরবর্তী জীবনের রাজনৈতিক চরিত্রেও প্রভাব ফেলে। রাজনীতি তার কাছে শুধু দলীয় পরিচয়ের বিষয় ছিল না, বরং রাষ্ট্র, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার নিয়ে ভাবনারও একটি ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের পর অবশ্য তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে থাকেননি। যোগ দেন শিক্ষকতায়। ঢাকা কলেজসহ কয়েকটি সরকারি কলেজে অর্থনীতি পড়িয়েছেন। পরে সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরেও কাজ করেছেন। তারপর জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে ছিলেন তিনি। এই পর্যায়টি তার রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আগেই রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামো, আমলাতন্ত্র এবং সরকারের ভেতরের কাজকর্ম সম্পর্কে তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তৈরি হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি থেকে রাজনীতির মাঠে : সরকারি চাকরি ছেড়ে মির্জা ফখরুল সক্রিয় রাজনীতিতে আসার প্রস্তুতি নেন। ১৯৮৮ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়। তার রাজনৈতিক উত্থান ঢাকার কেন্দ্রীয় রাজনীতি দিয়ে শুরু না হলেও স্থানীয় সরকার, জেলা সংগঠন এবং তৃণমূলের রাজনীতির মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে তিনি জাতীয় নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। অনেক জাতীয় নেতা যেখানে সরাসরি কেন্দ্রীয় রাজনীতির মাধ্যমে পরিচিতি পেয়েছেন, তার ক্ষেত্রে ছিল উল্টোপথ। ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, স্থানীয় সরকার এবং জেলা বিএনপির নেতৃত্ব পেরিয়ে তিনি জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
রাজনৈতিক পরিবারের হলেও পথ আলাদা : মির্জা ফখরুলের পরিবারও রাজনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। ঠাকুরগাঁওয়ের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকা মির্জা রুহুল আমিন ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালে পরপর দুবার পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ ১৭ বছর দায়িত্ব পালন করেন।
তার পরিবারে আরও বড় রাজনৈতিক নাম রয়েছে। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকদের একজন। তিনি ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের যুব শিবির অধিদপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। তবে এই রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে উঠলেও মির্জা ফখরুল নিজের রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করেছেন দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে।
বিএনপির দুঃসময়ের কাণ্ডারি : বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন মির্জা ফখরুল। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে খালেদা জিয়ার সরকারে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় ক্ষমতার বাইরে থাকার দীর্ঘ সময়ে।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি বিরোধী দলে যায়। এরপর ২০১১ সালে মির্জা ফখরুল দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালে তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। এ সময়টিই বিএনপির জন্য ছিল সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর একটি।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ড দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হলে দলটি বড় ধরনের নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। চেয়ারপারসন কারাগারে, আর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। ফলে দেশে বিএনপির প্রকাশ্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশের দায়িত্ব এসে পড়ে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ওপর।
খালেদা জিয়ার কারাবন্দিত্বের পুরো সময়জুড়ে মির্জা ফখরুল ছিলেন বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক মুখ। আদালত, সংবাদ সম্মেলন, রাজপথের কর্মসূচি থেকে শুরু করে সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক মোকাবিলা, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সামনে ছিলেন তিনি। চেয়ারপারসনের মুক্তি, তার আইনি অধিকার এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার দাবিতে বিএনপির কর্মসূচিগুলোতেও নেতৃত্ব দেন তিনি।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচন বিএনপির জন্য ছিল আরেকটি বড় পরীক্ষা। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় দলকে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রাখা, প্রার্থী ও জোটের সঙ্গে সমন্বয় এবং নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরার দায়িত্বও ছিল মির্জা ফখরুলের ওপর। নির্বাচনে তিনি নিজেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনে পরাজিত হন।
পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তার চিকিৎসা ও মুক্তির দাবিই বিএনপির রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে। ২০২০ সালে শর্তসাপেক্ষে মুক্তির পরও মির্জা ফখরুল তার চিকিৎসা ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে দলের অবস্থান সামনে রাখেন। বিশেষ করে ২০২১ সালে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার দাবিতে বিএনপির আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এই সময়ে রাজপথে পুলিশের বাধা, মামলা, গ্রেপ্তার, আদালত আর সংবাদ সম্মেলন ছিল তার রাজনৈতিক জীবনের নিত্যদিনের বাস্তবতা। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার গ্রেপ্তার হয়ে অনেক সময় কারাগারে ছিলেন। এই অভিজ্ঞতাই তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তির একটি বড় অংশ তৈরি করেছে। বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছে তিনি দুঃসময়ের পরীক্ষিত নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
কথায় কঠোরতা, আচরণে কোমলতা : মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক চরিত্রের আরেকটি দিক তার বক্তৃতা ও ব্যক্তিগত আচরণ। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্যে তিনি কখনো কঠোর হলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তাকে তুলনামূলকভাবে সংযত ও ভদ্র রাজনীতিক হিসেবে দেখা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেখানে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং উত্তপ্ত বক্তব্য প্রায় নিয়মিত ঘটনা, সেখানে মির্জা ফখরুলের ভাষা অনেক সময় আলাদা মাত্রা তৈরি করেছে। এই কারণেই দলীয় রাজনীতির বাইরে তাকে নিয়ে এক ধরনের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।
বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী : ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়ের মতো বিশাল পরিসরের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও তার হাতে আসে। দল ও সরকারের দুই জায়গায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আরেকটি পরীক্ষা শুরু হয়। এই দুই অভিজ্ঞতার সমন্বয়ই এখন তার রাজনৈতিক মূল্যায়নের একটি বড় অংশ।
কেকে/এলএ