বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬,
২৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: জরুরি গ্যাস আমদানিসহ ৪ প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন      ইউরোপীয় দেশগুলোর জাহাজ জব্দের হুঁশিয়ারি পুতিনের      প্রধানমন্ত্রীর সিল-স্বাক্ষর জাল করে প্রতারণা, ৬ জন রিমান্ডে      রাষ্ট্রপতি ইস্যুতে বৈঠক ডেকেছেন তারেক রহমান      মাধ্যমিকে ফল বিপর্যয় শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনারই বহিঃপ্রকাশ: সাইফুল হক      চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের অন্যতম রূপকার ঝু রংজি আর নেই      ডেঙ্গুতে এক দিনে ২ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৭২৩      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে দেশ
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৫ এএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

তীব্র গ্যাস সংকটের পাশাপাশি দেশজুড়ে লোডশেডিংও চরম আকার ধারণ করেছে। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টার ওপর লোডশেডিং থাকছে। এতে শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ, শিশু ও রোগীদের বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

আবার গ্যাস সংকটের কারণে বাসাবাড়ি থেকে সব খাতে প্রভাব পড়ছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) থেকে সিএনজি স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন লেগে গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস মিলছে না। বাসায়ও জ্বলছে না গ্যাসের চুলা।

শিল্প-কারখানায়ও উৎপাদন কমে গেছে। সবমিলে মানুষর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝে অপতৎপরতাও ছড়াচ্ছেন। আবার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা সুযোগের অপেক্ষা করছে। কারণ, সুযোগ পেলেই তারা দেশের মধ্যে পরিবেশ অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ও স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়ে গতকাল বুধবার (১২ আগস্ট) পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন।

চিঠিতে বলা হয়, জ্বালানি সংকট ও তীব্র দাবদাহের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে গত কয়েকদিনে চাহিদার তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ কম পাওয়ায় বেড়ে গেছে লোডশেডিং।

দৈনিক গড়ে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের ফলে বিভিন্ন স্থানে মানুষ ক্ষিপ্ত হয়ে পল্লী বিদ্যুতের উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুর করছে। এতে সেখানকার কর্মীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এ অবস্থায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে।

সীমাবদ্ধতায় কাজে লাগছে না সক্ষমতার বড় অংশ

প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকট, কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন, কারিগরি ত্রুটি ও অর্থসংকটের কারণে সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর মধ্যে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে, আর অনেক কেন্দ্র চলছে সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন নিয়ে। ফলে জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি।

সবশেষ রেকর্ড অনুযায়ী, সর্বোচ্চ লোডশেডিং দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে। আগের রেকর্ড ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই বিদ্যুৎ ঘাটতির নতুন রেকর্ড হয়েছে।

পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর দৈনিক প্রয়োজন প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও বর্তমানে কেন্দ্রগুলো পাচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। 

ফলে গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন চার হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও উৎপাদন ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি। অর্থাৎ গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধাক্কা লেগেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১১৭ কার্গো এলএনজি কিনবে সরকার
 
দেশে জরুরি গ্যাসের চাহিদা পূরণে চারটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১২ বছরে ১১৭ কার্গো এলএনজি কেনা হবে। বাকি তিন প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ছয় কার্গো এলএনজি কেনা হবে। গতকাল অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

সামাজিক মাধ্যমে বাড়ছে ক্ষোভ 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর কখন ফিরবে, তারও ঠিক নেই। ফলে রাতে ঘুমাতে না পেরে অনেকেই ছাদ, বারান্দা কিংবা বাড়ির বাইরে অবস্থান করেন। লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে। অনেকেই বিদ্যুৎ বিভাগের দায়িত্বশীলদের সমালোচনা করে দ্রুত লোডশেডিং কমানোর দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকাকে অসহনীয় ও অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বলে মন্তব্য করেন।

নেটিজেনদের কেউ লিখেছেন, গরমে মানুষের যখন হাঁসফাঁস অবস্থা, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে। অন্যরা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। আবার কেউ কেউ এর দায় নিয়ে বিদ্যুৎ মন্ত্রীর সরে যাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন।

বিদ্যুৎ না পেয়ে বিক্ষোভ, ভাংচুর করছেন গ্রাহকরা 

সাম্প্রতিক সময়ে একটি এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুতের লোডশেডিং অনেক বেড়ে গেছে। ফলে কয়েকদিন ধরেই বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের গ্রাহকরা বিক্ষোভ, ভাংচুর করছেন। গত ১০ আগস্ট টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও ঘনঘন লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে জামুর্কি পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সাবস্টেশনে হামলা চালান বিক্ষুব্ধ গ্রাহকরা।

সেখানে আব্দুল লতিফ নামে এক লাইনম্যানকে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ১১ আগস্ট দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে ক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর করেন। এর আগে গত ১ আগস্ট রাতে লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে স্থানীয় গ্রাহকরা আফতাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ এরিয়া অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন।

একই দিন পাবনার ঈশ্বরদীতে অসহনীয় লোডশেডিং ও বেশি বিলের অভিযোগে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর এক মিটার রিডারকে প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কর্মকর্তারাও গ্রাহকদের রোষের মুখে পড়েন।

নেত্রকোনায় দিন-রাত মিলিয়ে কোনো কোনো এলাকায় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। যে কোনো সময় বড় ধরনের হামলার আশঙ্কায় জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদন করা হয়েছে। নীলফামারীর ডোমার জোনাল অফিসের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় লিখিতভাবে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে।

সেখানে সাদা পোশাকে পুলিশি নজরদারি ও রাতে টহল বাড়ানো হয়েছে। ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গোপালগঞ্জ এলাকায় কর্মরত কর্মীদের নিরাপত্তা চেয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর

এমন অবস্থায় গতকাল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “বঙ্গোপসাগর উত্তাল হওয়ার কারণে ভাসমান টাওয়ার সামিট থেকে জ্বালানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলে হঠাৎ করে আবার সংকট শুরু হয়েছে। সমস্যা সমাধানের জন্য সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়ে কারও হাত নেই।”

বুধবার বিকেল নাগাদ গ্যাসের সমস্যা কিছুটা কমে আসবে। লোডশেডিংও কমে আসবে। বিদ্যুৎ-জ্বালানি নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতির কারণে এ সংকট চলছে। যে কোনো সময় এ সংকটের মুখোমুখি হতে হতো দেশকে। ভোগান্তির জন্য মানুষের কাছে পুনরায় ক্ষমাও চান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

গতকাল বিদ্যুতের সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৫৯২ মেগাওয়াট। এর আগে লোডশেডিং ৩ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বর্তমানে দেশে ৫ কোটি ২০ হাজার গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ৪ কোটি গ্রাহকই আরইবির। অর্থাৎ মোট গ্রাহকের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব সমিতির আওতায়। উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশও তাদের আওতাধীন এলাকায় সরবরাহ করা হয়। 

ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, “দীর্ঘদিনের এ সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারকে আগের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। প্রথমেই এ খাতে অযৌক্তিক ব্যয় কমাতে হবে। অযোগ্য লোকদের সরিয়ে সঠিক স্থানে সঠিক লোক বসাতে হবে।”

এ মুহূর্তে সংকট কাটাতে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো খুবই জরুরি। ব্যয়বহুল ফার্নেস তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাতিল করলে ৪২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে, যা দিয়ে বছরে ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করা যাবে। এতে তুলনামূলক কম দামে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।

বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, “বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাত ঢেলে সাজানোর সময় এসেছে। আমদানি করা এলএনজি দিয়ে সমাধান হবে না। দেশের অভ্যন্তরে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক জোর দেওয়া খুবই জরুরি।”

উল্লেখ্য, গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গ্যাস সংকট বেড়ে যায়। ১৫ দিন পর আংশিক চালুর পর গ্যাস সরবরাহ উন্নতি হলে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটি পুরোপুরো সারতে সেই বয়লারটিও বন্ধ করতে হয়। এতে গ্যাস সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।


কেকে/সাশ 


আরও সংবাদ   বিষয়:  ভয়াবহ লোডশেডিং   গ্যাস সংকট   বাংলাদেশ   
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close