গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি কালভার্ট বন্ধ করে গড়ে তোলা হয়েছে পাকা বাড়ি ও দোকানঘর। ফলে পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর মাশুল দিতে হচ্ছে তিনটি ইউনিয়নের হাজার হাজার পরিবারকে। উপজেলার চণ্ডিপুর, কঞ্চিবাড়ি ও শান্তিরাম ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত।
উপজেলার চণ্ডিপুর ইউনিয়নের ফরাজিপাড়া গ্রামে সরেজমিনে দেখা যায় এই ভয়াবহ চিত্র। বাড়ির ভেতরেও পানি ঢুকেছে। রাস্তাঘাট, আমন বীজতলা, সবজি ক্ষেত ও ফসলের জমি ডুবে গেছে। কৃষকরা উদ্বিগ্ন, আর চোখের সামনেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে সারা বছরের পরিশ্রম।
জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে ফরাজিপাড়া গ্রামের জয়নাল আবেদিনের ছেলে মোকছেদুল ইসলাম ভুট্টু জমি কিনে সেখানে একটি বাড়ি ও দোকান তৈরি করেন। বাড়ি তৈরির সময় স্থানীয়রা কালভার্টের মুখ বন্ধ করে মাটি দিয়ে ভরাট করতে শুরু করে। কিন্তু সেই বাধা উপেক্ষা করে তিনি একটি পাকা বাড়ি তৈরি করলে পানি চলাচলের পরিচিত পথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
বছরের পর বছর ধরে চণ্ডীপুর, কাঞ্চিবাড়ি ও শান্তিরাম ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি বিলের পানি এই কালভার্ট দিয়ে প্রবাহিত হয়ে স্লুইস গেট দিয়ে তিস্তা নদীর সঙ্গে মিশে যেত। গত বছর বর্ষায় কম বৃষ্টির কারণে সংকট ততটা প্রকট ছিল না। কিন্তু এই মৌসুমে টানা ভারী বৃষ্টির কারণে পানি জমে তা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। কালভার্টের মুখ বন্ধ থাকায় পানি বেরোনোর কোনো পথ না থাকায় একের পর এক গ্রামে জলাবদ্ধতা ছড়িয়ে পড়ছে। আমন বীজতলা ও সবজি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, গ্রামের রাস্তাঘাট ডুবে যাচ্ছে এবং জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।
চণ্ডিপুর ইউনিয়নের মধ্য চণ্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা আবদুর রহিম বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে চণ্ডীপুর, কাঞ্চিবাড়ি ও শান্তীরাম ইউনিয়নের বিভিন্ন বিলের পানি এই কালভার্ট দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। এখন কালভার্টটি বন্ধ করে বাড়িঘর তৈরি করা হয়েছে, ফলে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই কৃষি জমিতে পানি জমে যাচ্ছে।’
একই গ্রামের আরেক কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ‘আমরা এখন আমন মৌসুমের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ থাকায় জমিতে পানি জমছে। এতে আমন বীজতলা নষ্ট হচ্ছে এবং সবজিরও ক্ষতি হচ্ছে। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।’
পূর্ব চণ্ডিপুর গ্রামের বাসিন্দা আতিয়ার রহমান বলেন, ‘কালভার্ট দিয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ থাকায় বৃষ্টির পানি জমে এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েকটি গ্রামের রাস্তাঘাট ডুবে গেছে, এমনকি আমাদের বাড়িঘরও প্লাবিত হয়েছে। শুধু কৃষি জমিই নয়, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হচ্ছে। অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। তাই আমি প্রশাসনের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা শুধু গ্রামের সমস্যা নয়। চণ্ডিপুর, কাঞ্চিবাড়ি ও শান্তিরাম ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি বিলের পানি এই কালভার্ট দিয়ে প্রবাহিত হতো। এখন পানি জমে থাকায় বিস্তীর্ণ কৃষি জমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। হাজার হাজার মানুষ আটকা পড়েছেন। প্রশাসন অবিলম্বে ব্যবস্থা না নিলে কৃষকদের ক্ষতি আরও বাড়বে।’
চণ্ডিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মেহেদী মোস্তফা মাসুম বলেন, ‘বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। উপজেলা প্রকৌশলী ইউএনও স্যারের নির্দেশনায় ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। আমি আশা করি, পানি নিষ্কাশনের সমস্যাটি শীঘ্রই সমাধান হবে।’
এ বিষয়ে কথা হয় সুন্দরগঞ্জ উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তীর সাথে। তিনি বলেন, ‘ঘটনাস্থলে ইতোমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে। কেউ ইচ্ছামতো কোনো জলপথ বা নিষ্কাশন পথ বন্ধ করতে পারে না। ২০১৭ সালে এলজিইডির মাধ্যমে পাকা রাস্তার পাশাপাশি সেখানে একটি নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছিল। তার আগেও একই জায়গায় একটি কালভার্ট ছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি জলপথ বা পানি প্রবাহে অবৈধভাবে বাধা সৃষ্টির বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেবে।’
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তর ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে এবং প্রকৃত পরিস্থিতি যাচাই করা হচ্ছে। সরকারি জলপথ অবৈধভাবে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ডাকা হবে। তিনি যদি নিজ উদ্যোগে কালভার্টের মুখ না খোলেন, তবে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কারণ হয়, তবে তা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না।’
কেকে/ এমএস