টানা দুই দিনের ভারী বর্ষণে বান্দরবানের সীমান্তবর্তী নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় একদিকে যেমন জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে ছড়ার প্রবল স্রোতে ভেসে গিয়ে আলিয়া সোলতানা (৫) নামে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নামিয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধস, সড়ক ভাঙন, জলাবদ্ধতা ও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার মানুষ।
সোমবার (৬ জুলাই) সকাল ১০টার দিকে উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের রাঙ্গাঝিরি ছড়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শফি আলমের পাঁচ বছরের মেয়ে আলিয়া সোলতানা ছড়ায় নামার পর হঠাৎ প্রবল স্রোতে ভেসে যায়। পরে স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে ঈদগড় মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাইশারী ইউনিয়নের সাবেক ওয়ার্ড সদস্য ফরিদুল আলম বলেন, ‘শিশুটি পানির তীব্র স্রোতে ভেসে যায়। স্থানীয়রা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচাতে পারেননি। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।ৎ
এদিকে ভারী বর্ষণে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন বাইশারী ইউনিয়নের বাসিন্দারা। ইউনিয়ন পরিষদের কার্যালয় সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংস্কারকাজ চলমান থাকলেও তা শেষ না হওয়ায় বৃষ্টির পানিতে সড়কটি কর্দমাক্ত ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে শিক্ষার্থী, রোগী, বাজারগামী মানুষসহ সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এ ছাড়া সোনাইছড়ি, দোছড়ি ও বাইশারী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় খালের তীব্র স্রোতে সড়কের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও যোগাযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি, তবে ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে যানবাহন ও সাধারণ মানুষ।
অন্যদিকে ঘুমধুম ইউনিয়নের মধ্যমপাড়ায় পাহাড়ধসে শহর মুল্লুকের ছেলে আব্দুল হকের বসতবাড়ির ওপর পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে। এতে তার কাছারিঘর ও ঘরের মূল্যবান আসবাবপত্র মাটিচাপা পড়ে যায়। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছোটখাটো পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। ঘুমধুম ইউনিয়নের তুমব্রু কোনারপাড়ায় নিচু এলাকার অনেক বাড়িঘরে পানি ঢুকে পরিবারগুলো পানিবন্দী হয়ে পড়ে।
পরে বান্দরবান আসনের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরীর নির্দেশনায় এবং উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা পানিবন্দী পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করেন।
এদিকে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই দীর্ঘ সময় পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ বন্ধ থাকায় জনদুর্ভোগ আরও বেড়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় মোবাইল ফোন চার্জ দিতে পারছেন না বাসিন্দারা। একই সঙ্গে ফ্রিজে সংরক্ষিত খাদ্যসামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বেগ বাড়ছে।
বাইশারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলম বলেন, ‘টানা ভারী বর্ষণের কারণে ইউনিয়নের বিভিন্ন সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। জনগণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. এনামুল হাসান বলেন, ‘পাহাড়ধস-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনীয় খাদ্যসহ সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত রাখতে উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।’
কেকে/এমএ