কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার দেহুন্দা ইউনিয়নে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। ইউনিয়ন বিএনপির শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবার ‘মাদক’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
একে অপরকে মাদকসেবী ও মাদক কারবারি বলে প্রকাশ্যে অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়া, বাড়িঘরে হামলা-ভাঙচুর, লুটপাটের অভিযোগ এবং থানায় পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরেই দেহুন্দা ইউনিয়ন বিএনপির বিভিন্ন নেতার মধ্যে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিল। সম্প্রতি সেই বিরোধ আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এরপর একে অপরের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেহুন্দা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য রফিকুল ইসলাম রাজু এবং তার চাচাতো ছোট ভাই, ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. স্বাধীন মিয়াকে মাদকসেবী ও মাদক কারবারি হিসেবে আখ্যায়িত করেন একই ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি কামাল হোসেন লাল। এর জবাবে রফিকুল ইসলাম রাজু দাবি করেন, প্রকৃতপক্ষে কামাল হোসেন লাল নিজেই একজন মাদকসেবী এবং তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই শুক্রবার (৩ জুলাই) বিকাল ও সন্ধ্যায় দেহুন্দা ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ ওঠেছে, মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে কামাল হোসেন লালের নেতৃত্বে একদল লোক ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রফিকুল ইসলাম রাজুসহ কয়েকজনের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কামাল হোসেন লালের মাদক সেবনের দাবি করা একটি ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি ঘিরে এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে দুই পক্ষই করিমগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।
বাড়িঘর ভাঙচুরের শিকার দাবি করে দেহুন্দা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ওয়ার্ড সদস্য রফিকুল ইসলাম রাজু বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে তার এলাকায় মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন এবং বিভিন্ন সময় জনসচেতনতামূলক সভা করেছেন।
তার দাবি, ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি কামাল হোসেন লাল তাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বাড়িঘর ভাঙচুরে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে পরিকল্পিতভাবে হামলার ঘটনা ঘটানো হয়।
রফিকুল ইসলাম রাজু বলেন, ‘হামলার সময় আমি বাড়িতে ছিলাম না। আমার অনুপস্থিতিতে বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর, আসবাবপত্র নষ্ট ও লুটপাট চালানো হয়। এখন সেই ঘটনাকে আড়াল করতেই আমাকে ও আমার চাচাতো ভাইকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করব, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যদি আমার বিরুদ্ধে মাদকের সামান্যতম সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে আমার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু যদি অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তাহলে যারা হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে এবং যাদের বিরুদ্ধে মাদকের মামলা রয়েছে, তাদেরও আইনের আওতায় আনা উচিত।’
রফিকুল ইসলাম রাজু জানান, ঘটনার বিষয়ে করিমগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচার দাবি করেন।
বাড়িঘর ভাঙচুর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেহুন্দা ইউনিয়ন বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি কামাল হোসেন লাল তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, ‘যাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে তারা প্রকৃতপক্ষে মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। তাদের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেরাই বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর করেছে। এর সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিও সম্পর্কে কামাল হোসেন লালের দাবি, এটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।
তার ভাষ্য, রাজনৈতিকভাবে তাকে হেয়প্রতিপন্ন ও সামাজিকভাবে সম্মানহানি করতেই একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে এই ভিডিও তৈরি করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েছে।
এদিকে দেহুন্দা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মো. স্বাধীন মিয়া বলেন, ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রথমে ফেসবুকের একটি ভুয়া আইডি থেকে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা সংবাদ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করে।’
তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনার পর আমি করিমগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছি। এরপর থেকেই একই চক্র আমাকে এবং আমার বড় ভাই রফিকুল ইসলাম রাজুকে মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’
স্বাধীন মিয়ার দাবি, দল তাদের অতীত কর্মকাণ্ড, সততা ও সাংগঠনিক যোগ্যতা বিবেচনা করেই ইউনিয়ন বিএনপি ও ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ।
তিনি দেশবাসী, গণমাধ্যমকর্মী ও প্রশাসনের প্রতি নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়ে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দুই নেতার প্রকাশ্য বিরোধ, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা ও ভিডিও বিতর্কের পর থেকে দেহুন্দা ইউনিয়নে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করায় যেকোনো সময় নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা রয়েছে।
তাদের মতে, রাজনৈতিক বিরোধ এখন ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
এ বিষয়ে করিমগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান দুলাল সিকদার বলেন, ‘কোনো বিষয়ে প্রমাণ ছাড়া মন্তব্য করা ঠিক নয়। দল বিষয়টির সত্যতা যাচাই করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কামাল নামে আমাদের সিনিয়র সহ-সভাপতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। সেটি কতটা সত্য, তা যাচাই করা প্রয়োজন। একইভাবে রফিকুল ইসলাম রাজু যে অভিযোগ দিয়েছেন, সেটিও তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই দল প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেবে।’
এ নিয়ে করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব বলেন, ‘উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যে তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
কেকে/এমএ