অতিভারী বর্ষণের ফলে কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাটির নিচে চাপা পড়ে চার শিশু ও দুই নারীসহ অন্তত ৮ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে।
রোববার (৫ জুলাই) দিবাগত রাত এবং সোমবার (৬ জুলাই) সকালের মধ্যে উখিয়ার ১৫ নম্বর জামতলী, ১১ নম্বর বালুখালী ও ৭ নম্বর কুতুপালং ক্যাম্পে এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটে।
ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীদের যৌথ প্রচেষ্টায় দুর্ঘটনাকবলিত স্থানগুলো থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর নতুন করে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় ক্যাম্পগুলোর লাখো বাসিন্দার মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। পাহাড়ের খাড়া ঢালে ও পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করা হাজার হাজার পরিবার এখন চরম মৃত্যুঝুঁকিতে রয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ের মাটি নরম হয়ে ভোরে ঘুমন্ত মানুষের বসতঘরগুলোর ওপর ধসে পড়ে।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি/৬ ব্লকে। সেখানে পাহাড়ের বিশাল মাটির চাপায় মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের কাঁচা ঘরটি ধসে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) ও তাদের ৪ বছরের শিশু সন্তান মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
দ্বিতীয় বড় ধসের ঘটনাটি ঘটে ১১ নম্বর বালুখালী ক্যাম্পের সি/১১ ব্লকে। সেখানে মাটিচাপায় একই সাথে চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতরা হলেন—আব্দুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩) এবং মোহাম্মদ রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)। এ ঘটনায় আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এছাড়া কুতুপালং ৭ নম্বর ক্যাম্পের ডি/৭ ব্লকে পাহাড় ধসে মাটির নিচে চাপা পড়ে মো. একরাম (৭) নামের রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, গভীর রাতে খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের টিম জামতলী ক্যাম্পে উদ্ধার কাজ শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় ৩টি স্পট থেকে মোট আটজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
৮ এপিবিএনের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক রিয়াজ উদ্দিন আহমদ জানান, অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ের পাদদেশে মাটি আলগা হয়ে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পাহাড়ের ঢালে ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বসবাসকারী বাকি পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে এপিবিএন ও ক্যাম্প ভলান্টিয়াররা কাজ করছেন।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগে থেকেই মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছিল। নতুন করে দুর্ঘটনা এড়াতে সবাইকে অতি দ্রুত সরকারি নির্দেশনা মেনে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।’
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মিজানুর রহমান জানান, বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই পাহাড়ের ঢালে থাকা পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ২০ হাজার রোহিঙ্গাকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে বিস্তীর্ণ ক্যাম্প জুড়ে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মানুষ পাহাড় কেটে তৈরি করা ঝুপড়ি ঘরে গাদাগাদি করে থাকায় ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যাচ্ছে না। ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোকে আপদকালীন সময়ের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও দুই দিন এই অঞ্চলে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থানকারী বাকি হাজারো পরিবারের মধ্যে এখন চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
কেকে/এমএ