জেনারেটিভ এআই হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এমন একটি রূপ যা মানুষের জ্ঞানীয় (Cognitive) ক্ষমতাকে অনুকরণ করতে বিশেষায়িত মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করে। এই বিশেষ এআই নতুন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বা সম্পূর্ণ নতুন কোনো কন্টেন্ট তৈরিতে সরাসরি সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, মানুষের প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করে কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে এটি ডেটা, যেমন টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিও বা এগুলোকে ব্যবহার করে একটি গ্রহণযোগ্য উত্তর বা যেকোন কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে।
এআই অ্যালগরিদমগুলো মূলত ভবিষ্যদ্বাণী, শ্রেণিবিভাগ, প্রেডিকটিভ বিশ্লেষণ এবং প্রবণতা বিশ্লেষণের মতো কাজগুলো করে থাকে। জেনারেটিভ এআই শুধু এসব কাজই করে না, বরং এটি সম্পূর্ণ নতুন কিছু তৈরি করতেও ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আগে যেখানে আমরা মেশিন লার্নিং ব্যবহার করতাম কেবল বিক্রয়ের ডেটার পূর্বাভাস দিতে, এখন আমরা অন্যান্য অনেক ব্যবসায়িক ডেটার পাশাপাশি বিক্রয়ের ডেটা নিয়ে কাজ করার জন্য জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করতে পারি। আমরা সাধারণত এই এআই-কে রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের মাধ্যমে পরিচালিত একটি বিশেষায়িত সিস্টেম হিসেবে দেখে থাকি। এটি স্বয়ংক্রিয় উপায়ে নতুন ডেটা, কন্টেন্ট বা অনুরূপ আউটপুট তৈরি করতে ঐতিহাসিক ডেটা বা কন্টেন্ট ব্যবহারের ওপর ফোকাস করে।
মজার ব্যাপার হলো, এই এআই প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ডেটা ও কন্টেন্ট থেকে শিখতে থাকে এবং নিজেকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করে যাতে এর আউটপুটগুলো ট্রেনিং ডেটার মতো হয় এবং নতুন তৈরি হওয়া আউটপুটের সঙ্গে মূল ডেটার হুবহু কোনো মিল পাওয়া যাবে না। অন্য কথায় বলা যেতে পারে যে, নতুন তৈরি হওয়া কন্টেন্ট বা ডেটা সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে, যার সঙ্গে ট্রেনিং ডেটার সরাসরি কোনো মিল থাকে না। এই নতুন আউটপুটকে বর্তমান ডেটার সঙ্গে তুলনা করে নতুন এনালাইসিস ও জ্ঞান তৈরি করা সম্ভব, যা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
এই জেনারেটিভ এআই মূলত একাধিক ডিপ-লার্নিং মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়ে থাকে। জেনারেটিভ এআই-এর একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রয়োগ হলো ছবি তৈরি করা, যা টেক্সট বা বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে বাস্তবসম্মত বা শৈল্পিক ছবি তৈরি করতে পারে। এটি অডিও বা ভিডিও- তৈরি করতে পারে, নতুন মিউজিক কম্পোজিশন, সাউন্ড বা বিভিন্ন ছবির সমন্বয়ে সিন্থেসাইজড মাল্টিমিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করতে পারে। শুধু ছবি সংশ্লেষণই নয়, এই এআই সিন্থেটিক (কৃত্রিম) ডেটা তৈরি করে ভবিষ্যতে মানুষের ব্যবহারের জন্য বাস্তবসম্মত ডেটা মডেলও তৈরি করতে পারে। যাহোক, এখন প্রশ্ন হলো সরকারি বা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় জেনেরেটিভ এআই কি কিছু করতে পারে?
বর্তমানের এই পৃথিবীতে, একুশ শতকের বিস্ময়কর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করা আমাদের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা জায়গায় জেনেরেটিভ এআই নিয়ে কাজ করার বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে এবং এই বিষয়গুলো নিয়ে আমি গভীরভাবে আমাদের দেশের জন্য এর ব্যবহার নিয়ে এনালাইসিস করতে চাই। গত কয়েক বছর ধরে, আমি আমার বিভিন্ন চিন্তাভাবনাগুলো নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে লেখালেখি করছি। প্রবন্ধের একটি সিরিজে আমি আমার গবেষণার ফলাফল তুলে ধরার চেষ্টা করেছি যে কীভাবে আধুনিক জেনেরেটিভ এআই প্রযুক্তি এবং এর ধারণা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার কাঠামোতে পরিবর্তন করতে পারে এবং সরকারকে জনগণের কল্যাণে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম করে তুলতে পারে।
শহীদ জিয়ার স্বনির্ভরতার আদর্শ এবং প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ৩১-দফা আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনের অনুপ্রেরণায় আমরা যদি গ্রামীণ বাংলাদেশে বসবাসকারী প্রায় ৬০-৬৮% নারী এবং আমাদের ৩৩% যুব জনসংখ্যার (যাদের গড় বয়স মাত্র ২৭.৬ বছর) সৃজনশীলতাকে আরও বেশি মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই মতো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ দ্রুত একটি সমৃদ্ধ ব্যবস্থাপনার উন্নত ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। এই জেনেরেটিভ এআই রূপকল্প সরাসরি নারীদের ক্ষমতায়ন এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিশ্চিত করে।
কৃষি খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড, এবং এর পূর্ণ সম্ভাবনা আমাদের সামনে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য বর্তমানে আমাদের পর্যাপ্ত ডেটা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব রয়েছে। জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকরা কীটনাশকের ব্যবহার কমাতে এবং তাদের আয় দ্বিগুণ করতে পারবেন। জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তিনির্ভর প্রিসিশন ফার্মিং (নির্ভুল কৃষি) নিশ্চিত করতে উত্তরবঙ্গের মাটির জিনোম ডেটা বিশ্লেষণের জন্য শস্যভাণ্ডারের ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে একটি আঞ্চলিক ডেটা হাব স্থাপন করা এখন সময়ের দাবি।
একইভাবে, দক্ষিণাঞ্চলের জন্য একটি ডেটা ব্যাংক ব্লু ইকোনমি (সুনীল অর্থনীতি) এবং উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ওপর ফোকাস করবে, যা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পানির মান নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করবে। সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি স্তরে জেনারেটিভ এআই-চালিত কোল্ড স্টোরেজ এবং চাহিদার পূর্বাভাস ব্যবহার করে, আমরা ফসল কাটার পরের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য দূর করতে পারি।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন করতে, আমাদের অবিলম্বে আরও বেশি মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে একটি কাঠামো গ্রহণ করতে হবে। এই প্রযুক্তিটি এমন কোনো সাধারণ সিস্টেমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, যা কেবল তথ্য প্রদান করে বা নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করবে; বরং একটি সক্রিয় এবং স্বায়ত্তশাসিত ডিজিটাল সহকর্মী হিসেবে কাজ করার ক্ষমতা থাকবে।
প্রথাগত জেনারেটিভ এআই, যেমন চ্যাটজিপিটি, মূলত প্রতিক্রিয়াশীল; এটি পরিচালনার জন্য ক্রমাগত মানুষের প্রম্পট বা নির্দেশের প্রয়োজন হয় এবং একটি কাজ শেষ করার পর এটি নিষ্ক্রিয়ভাবে পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করে। এর বিপরীতে, আরও বেশি মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই একটি প্রোঅ্যাকটিভ বা স্বপ্রণোদিত সিস্টেম হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। আপনাকে কেবল একটি চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে হবে; এটি সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপগুলো নির্ধারণ করতে একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলকে কেন্দ্রীয় যুক্তি ইঞ্জিন হিসেবে ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন ডিজিটাল টুলের সমন্বয় করে স্বাধীনভাবে কাজটি সম্পন্ন করে। এমনকি যদি এটি চলার পথে কোনো বাধা বা ত্রুটির সম্মুখীন হয়, তবে এটি থেমে যাবে না, বরং নিজেই বিকল্প পথ খুঁজে বের করার অভিযোজন যোগ্যতাসম্পন্ন হবে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় এই জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির প্রয়োগ ম্যানুয়াল বা সেকেলে আইসিটি ব্যবস্থাপনার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে পারে। সেই সঙ্গে নাগরিক সেবাগুলোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবে। রাষ্ট্র পরিচালনায়, নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জনমতকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যানালিটিক্সও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এটি কেবল লাইক বা শেয়ার গণনার বিষয়কে বোঝায় না, বরং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং এবং জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে মানুষের মন্তব্যের অন্তর্নিহিত মনোভাব পরিমাপ করাকেও বোঝায়।
আমার প্রস্তাবিত সিস্টেমে, একটি বিস্তারিত রিয়েল-টাইম ম্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল অঞ্চলগুলোর সব ধরনের ডাটা এবং তাদের বিশ্লেষণ আমরা দেখতে পারবো। উদাহরণ স্বরূপ, এক ধরনের বিশ্লেষণে দেখা যেতে পারে যে, ঢাকা রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলেও চট্টগ্রামে নেতিবাচক মন্তব্যের হার বেশি, যা নীতিনির্ধারকদের তাদের ভুল সংশোধন করতে এবং জনবান্ধব সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। এই প্রযুক্তিটি নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আস্থার ব্যবধান দূর করতে একটি স্বচ্ছ দর্পণ হিসেবে কাজ করবে।
স্ট্যান্ডার্ড জেনারেটিভ এআই থেকে আরও বেশি মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই-এ বিবর্তনের এই ধারা কেবল একটি প্রযুক্তিগত আপগ্রেড নয়; এটি সুশাসন এবং জনপ্রশাসন কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের একটি প্রধান অনুঘটক। যেখানে স্ট্যান্ডার্ড জেনারেটিভ এআই প্রম্পট-নির্ভর এবং নির্দিষ্ট ডেটার ওপর ভিত্তি করে কন্টেন্ট তৈরি করে, সেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো জটিল ক্ষেত্রগুলোতে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইনি বাধ্যবাধকতা এবং নাগরিক অধিকার জড়িত, কেবল কন্টেন্ট তৈরির চেয়ে আরও বেশি কিছুর প্রয়োজন হয়। এর জন্য এমন একটি সিস্টেম প্রয়োজন যা স্বায়ত্তশাসিতভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে, ডিজিটাল টুলগুলোর সমন্বয় করতে পারে এবং প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই এই শূন্যস্থান পূরণ করতে সক্ষম, যা শাসনব্যবস্থাকে একটি নিষ্ক্রিয় প্রক্রিয়া থেকে সক্রিয় ও ফলাফল-চালিত সিস্টেমে রূপান্তরিত করবে। এই জেনারেটিভ এআই তথ্য প্রদানের জন্য এটি পরিসংখ্যানগত সম্ভাবনার (Statistical Probabilities) ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে এবং প্রাথমিকভাবে একটি স্বতন্ত্র (Standalone) সফটওয়্যার হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই ফলাফল নিশ্চিত করার ওপর ফোকাস করবে। যেহেতু এর উচ্চ ধারণক্ষমতা রয়েছে এবং এটি স্বাধীনভাবে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে, তাই এটি বহু-স্তরের লজিক্যাল প্ল্যানিং এবং অ্যানালাইসিস পরিচালনা করতে এবং এপিআই ও ডেটাবেসের সঙ্গে গভীরভাবে একীভূত হয়ে থাকতে সক্ষম হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ত্রুটি দেখা দিলে, মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই নিজেই সমস্যার সমাধানের জন্য বিকল্প পথ খুঁজে নিবে এবং এর মূল শক্তি হবে লক্ষ্য-ভিত্তিক আচরণ এবং সহযোগিতামূলক ক্ষমতা, যা এটিকে কেবল একটি টুলের বদলে একটি ‘ডিজিটাল সহকর্মী’তে পরিণত করবে।
উন্নত দেশগুলো ইতোমধ্যে জনসেবায় মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই-এর পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, এস্তোনিয়া ‘KrattAI (Kratt)’-এর মাধ্যমে তাদের আন্তঃসংস্থা নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সাবলীলভাবে জটিল কাজগুলো পরিচালনা করে। সিঙ্গাপুরে ‘LifeSG’-এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো দেড় কোটিরও বেশি প্রশ্নের উত্তর দেয়, যা প্রশাসনিক চাপ ৫০% কমিয়ে দেয়।
যুক্তরাজ্যে ‘ইড়ননর’ সিস্টেম মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৮২% জনসাধারণের জিজ্ঞাসার সমাধান করে। পর্তুগালের ‘ GOV.UK Chat’ ২,৩০০টি সেবার জন্য বহুভাষিক গাইড প্রদান করে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে আলাস্কা ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট এবং পারমিট নবায়ন সহজ করতে ‘myAlaska’ পোর্টাল ব্যবহার করে এবং নিউইয়র্ক সিটির এমটিএ রেল পরিদর্শনে যান্ত্রিক ত্রুটিগুলো দ্রুত সনাক্ত করতে ও মেরামত করতে মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে। বৈশ্বিক ডাটা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা বলছেন যে, ২০২৭ সালের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ শহর তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে আরও বেশি মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই সিস্টেম যুক্ত করবে।
আমি মনে করি, জনপ্রশাসনে জেনারেটিভ এআই ব্যবহারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বর্তমান চলমান সিস্টেমের মধ্যে পরিচালিত হয়ে এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অস্বচ্ছতা, যা কিনা আমাদের মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই ‘গ্লাস বক্স’ গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। এই মডেলে, জেনারেটিভ এআই-এর প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও যৌক্তিকতা ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে। যদি কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় বা টেন্ডার বাতিল করা হয়, এআই সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিক ভিত্তি প্রদান করবে, যা কর্মকর্তাদের প্রয়োগকৃত নিয়মগুলো পরবর্তীতে যাচাই করতে সাহায্য করবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো বিশ্বাস করে যে, এটি সক্রিয়ভাবে সরকারি তহবিলের অপব্যবহারের ‘হটস্পট’গুলো শনাক্ত করতে পারবে, যা প্রেডিকটিভ অডিটিং-এর পথ প্রশস্ত করবে। গ্লাস বক্স গভর্ন্যান্স পাঁচটি নির্দিষ্ট ধাপে কাজ করবে। প্রথমত, ডেটা ইনজেশন প্রক্রিয়ায় কঠোরভাবে গোপনীয়তা বজায় রেখে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হবে। দ্বিতীয়ত, আর্কিটাইপ ক্লাসিফিকেশন এর মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতির প্রকৃতি নির্ধারণ করা হবে। তৃতীয়ত, ইন্টারভেনশন সিলেকশন ধাপে নির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক নিয়মের ওপর ভিত্তি করে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। চতুর্থত, মেসেজ ডেলিভারি-তে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নিয়মকানুন নিশ্চিত করে কাক্সিক্ষত সেবা প্রদান করা হবে। সবশেষে, আউটকাম মেজারমেন্টের মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর কার্যকারিতা এবং স্বচ্ছতা মূল্যায়ন করা হবে। এটি একটি ‘জিরো-ট্রাস্ট’ আর্কিটেকচারের ওপর নির্মিত হবে, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনে জেনারেটিভ এআই-এর একীকরণ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, যা প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের ৩১-দফা সংস্কার কর্মসূচির লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মধ্যে দফা ২ (অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র) অনুযায়ী মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই ধর্ম, বর্ণ বা রাজনীতি নির্বিশেষে ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করতে পারবে, যা ব্যক্তিগতকৃত জনসেবার মাধ্যমে একটি নতুন ‘সামাজিক চুক্তি’ তৈরি করবে। দফা ১৩ (দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স) ও দফা ১৫ (অর্থনৈতিক সংস্কার) বাস্তবায়নে এই প্রযুক্তি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে। এছাড়া এই প্রযুক্তির সংযোজন নাগরিকদের অভিযোগগুলো দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করবে এবং সমাধানের অডিট লগ বজায় রাখবে।
প্রযুক্তি বিষয়ে তরুণদের দক্ষ করে তোলার মাধ্যমে তারেক রহমানের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আইসিটি শিক্ষার আধুনিকায়নের ওপর নিহিত। জেনারেটিভ এআই তরুণ ফ্রিল্যান্সার এবং উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা বৃদ্ধির প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে সক্ষম। আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে (জনতাত্ত্বিক লভ্যাংশ) কাজে লাগাতে, মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই-কে অবশ্যই রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণের সঙ্গে একীভূত করতে হবে।
যাহোক, এর বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও, মানবিক ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটিভ এআই-এর ঝুঁকিগুলো উপেক্ষা করা যায় না এবং এ ক্ষেত্রে ‘হিউম্যান-ইন-দ্য-লুপ’ (মানুষের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান) তদারকি নিশ্চিত করা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। এর অন্যতম ঝুঁকি হলো স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার, যেখানে এআই কোনো লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভুল পথ বেছে নিতে পারে। এছাড়া ডেটা ড্রিফটের কারণে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তথ্যের পরিবর্তনের ফলে এআই-এর সিদ্ধান্তগুলো ভুল হতে পারে। যদি ট্রেনিং ডেটা পক্ষপাতদুষ্ট হয়, তবে জেনারেটিভ এআই-এর পক্ষপাতিত্ব বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
পাশাপাশি, জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিতে পারে, কারণ এআই-এর কোনো ভুলের জন্য কে দায়ভার বহন করবে তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যায়। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবেলা করার জন্য, দেশের আইন, নৈতিকতা এবং সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জেনারেটিভ এআই সিস্টেম তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বিদেশি হাতে চলে না যায়।
পরিশেষে বলতে চাই, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান প্রযুক্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন এবং খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে একটি কৃষি বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। আজ, একুশ শতকে, জেনারেটিভ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে সেই রূপকল্পকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান কর্তৃক ঘোষিত বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য ৩১-দফার রূপকল্প দ্বারা পরিচালিত হয়ে, আমাদের তরুণ বিজ্ঞানীরা দেশীয় সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন।
জেনারেটিভ এআই, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আমাদের কৃষক ও তরুণদের নিরলস পরিশ্রমের সমন্বয়ে আমরা একটি স্বনির্ভর, টেকসই এবং সমৃদ্ধ ভবিষৎমুখী বাংলাদেশ গড়ে তুলব। এই রূপান্তরের মাধ্যমে, একটি উন্নত ও বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের সেবা ও অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
লেখক : প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই
নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া।
ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, জাতীয়তাবাদী আইসিটি ফোরাম এবং বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিঃবিশ্বে শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী পেশাজীবী এক্সপার্টিজ গ্রুপের সদস্য
কেকে/ এমএস