গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়াতে সরকার বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে গ্রাহকের বিদ্যুতের মূল্য তুলনামূলক কম রাখতে নিয়মিত ভর্তুকিও দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরেই বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির অঙ্ক চল্লিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে; তথ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অঙ্কটি প্রায় একচল্লিশ হাজার কোটি টাকা। আসন্ন অর্থবছরের বাজেটে এই চাহিদা আরও বাড়বে বলেই ইঙ্গিত মিলছে কোনো কোনো হিসাবে তা পঁচাত্তর হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত গড়াতে পারে, আর সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের জন্য বরাদ্দ থাকছে মোট বরাদ্দের প্রায় এগারো শতাংশ। সংখ্যাগুলো শুধু কাগজে-কলমের হিসাব নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের রাজস্ব সক্ষমতা, নাগরিকের করের টাকা আর একটি খাতের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতার প্রশ্ন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই ভর্তুকি শুধু জনগণকে সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিদ্যুৎ খাতের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, বকেয়া ও আর্থিক ঘাটতি পূরণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কাঠামোগত সংকটকে জিইয়ে রেখে যে আপাতকালীন সমাধান খোঁজা হয়েছে, তা এখন ঘাড়ের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যাগুলো একদিনে তৈরি হয়নি, তৈরি হয়েছে ধাপে ধাপে।
এই ধাপের প্রথম পর্বটি ছিল উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের বিস্তর ব্যবধান। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়ের প্রকৃত ব্যয় বেশি হলেও গ্রাহকের কাছ থেকে তুলনামূলক কম নেওয়া হয়েছে, আর এই পার্থক্যটুকু সরকার পূরণ করেছে ভর্তুকির মাধ্যমে। কিছু কেন্দ্রের প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের চিত্র দেখলে ব্যবধানটি স্পষ্ট হয় রাউজানের একটি ২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য পড়ে প্রায় বত্রিশ টাকা, আবার পায়রার কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে তা নেমে আসে প্রায় সাড়ে চোদ্দ টাকায়। এত বিচিত্র ব্যয়কাঠামো একটি অভিন্ন খুচরা মূল্যের আওতায় সমন্বয় করতে গিয়েই ভর্তুকির প্রয়োজন দিন দিন বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত আর্থিক স্তর তৈরি করে সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়েছে। জেনারেশন, ট্রান্সমিশন, ডিস্ট্রিবিউশন বিভিন্ন সরকারি কোম্পানি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীর মধ্য দিয়ে অর্থের প্রবাহ ও প্রশাসনিক ব্যয় দুটোই বেড়েছে। তৃতীয়ত, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও চুক্তিগত দায় বড় একটি কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলেও চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রগুলোকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়, ফলে বিদ্যুৎ না পেলেও রাষ্ট্রের আর্থিক দায় তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মূল্যায়ন হলো, বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রায় চার-পঞ্চমাংশই এখন ব্যয় হচ্ছে এই ক্যাপাসিটি চার্জ মেটাতে। বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি সইয়ের সময় ধরে নেওয়া হয়েছিল, কেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার প্রায় আশি শতাংশ ব্যবহার হবে; বাস্তবে তা নেমে এসেছে বিয়াল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ কেন্দ্রের সিংহভাগ সক্ষমতা অলস পড়ে থাকছে, অথচ তার দাম গুনতে হচ্ছে জনগণের করের টাকায়। ২০০৯ সালের পর গত দেড় দশকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে বলে সংসদে উপস্থাপিত সরকারি হিসাবেই উঠে এসেছে।
এর পরের ধাপটি হলো ভর্তুকি থেকে বকেয়া, আর বকেয়া থেকে ঋণে রূপান্তরের চক্র। সময়মতো ভর্তুকির অর্থ না এলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া বাড়ে, বকেয়া মেটাতে ঋণ নিতে হয়, ঋণের সুদ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায় আরও স্ফীত হয়। সাম্প্রতিক এক নিরীক্ষা তথ্যেই এই চক্রের একটি নমুনা মেলে আগের একটি অর্থবছরের তুলনায় পরের বছর বেসরকারি ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে প্রায় পনেরো শতাংশ কম বিদ্যুৎ কেনা হলেও তার জন্য ব্যয় বরং বেড়েছে; বাষট্টি হাজার কোটি টাকার বেশি গুনতে হয়েছে, যেখানে আগের বছর তা ছিল বাহান্ন হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। কম বিদ্যুৎ কিনে বেশি অর্থ ব্যয় হওয়ার এই প্রবণতাই বলে দেয়, সমস্যাটি নিছক চাহিদা-জোগানের নয়, কাঠামোরই।
সবশেষে যে সমস্যাটি এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ খাতকে সবচেয়ে বেশি ভোগাচ্ছে, তা হলো এই ভর্তুকির প্রকৃত সমাধান না খুঁজে সমস্যাগুলোকে চাপা দিয়ে রাখা। উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, অপ্রয়োজনীয় আর্থিক স্তর, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, সঞ্চালন-বিতরণে সিস্টেম লস ও সামগ্রিক অদক্ষতা যদি একই থেকে যায়, তাহলে ভর্তুকি কেবল সাময়িক ঘাটতি পূরণ করবে মূল সমস্যার সমাধান করবে না। সরকার নিজেও বিষয়টি অস্বীকার করছে না; বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সম্প্রতি স্বীকার করা হয়েছে, বহু বড় বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেও জ্বালানি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এখনো দেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা লাঘবে আইনি পথে হাঁটার কথাও ভাবা হচ্ছে বলে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে, যদিও এক ধাক্কায় তা বন্ধ করে দিলে সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সরকারের করণীয় হলো।
প্রথমত, গত দেড় দশকের বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির একটি পূর্ণাঙ্গ নিরীক্ষা করতে হবে। কত টাকা, কোন প্রতিষ্ঠানে, কোন কারণে ব্যয় হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ভর্তুকিকে তিন ভাগে ভাগ করতে হবে জনগণের প্রয়োজনীয় সহায়তা, জাতীয় স্বার্থে অপরিহার্য ভর্তুকি এবং অদক্ষতা ও অতিরিক্ত ব্যয়জনিত ভর্তুকি। এই তৃতীয় শ্রেণির ভর্তুকি ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নিম্ন-ব্যবহারকারী তথা লাইফলাইন গ্রাহক শ্রেণিকে সুরক্ষা দেওয়ার নীতি বজায় রাখা জরুরি শূন্য থেকে পঁচাত্তর ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী প্রায় পঁয়ষট্টি শতাংশ গ্রাহকের ওপর নতুন মূল্যচাপ না ফেলার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এই অর্থে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
তৃতীয়ত, প্রতিটি সরকারি কোম্পানির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করতে হবে। একই কাজের জন্য একাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে তা একীভূত বা পুনর্গঠন করতে হবে।
চতুর্থত, ভর্তুকি পাওয়ার সঙ্গে সুনির্দিষ্ট শর্ত যুক্ত করতে হবে। খরচ কমানো, বকেয়া আদায়, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আর্থিক সংস্কার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
পঞ্চমত, ভর্তুকি যেন কোম্পানিকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার না হয়; বরং প্রয়োজনে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের গ্রাহককে সরাসরি লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিতে হবে।
ষষ্ঠত, বিদ্যমান বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলোর বিশেষত ক্যাপাসিটি চার্জ-সংক্রান্ত শর্তাবলির নিরপেক্ষ পর্যালোচনা প্রয়োজন। লোড ফ্যাক্টরের বাস্তব চিত্র বিবেচনায় নিয়ে চুক্তি পুনর্লিখন বা পুনর্বিন্যাসের আইনি ও কারিগরি সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখতে হবে, যাতে অব্যবহৃত সক্ষমতার দায় অনির্দিষ্টকাল জনগণের কাঁধে না থাকে।
বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়াই সমাধান নয়; ভর্তুকির প্রয়োজন কেন প্রতি বছর বাড়ছে, সেই কারণ চিহ্নিত করে দূর করাই প্রকৃত সমাধান। রাষ্ট্রের অর্থ দিয়ে বছরের পর বছর একটি অদক্ষ আর্থিক কাঠামো টিকিয়ে রাখা কোনো উন্নয়ননীতি হতে পারে না। এখন প্রয়োজন আরও বেশি ভর্তুকি নয়, বরং ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার যেখানে জনগণের প্রকৃত প্রয়োজনীয় সহায়তা অক্ষুণ্ন থাকবে, কিন্তু অদক্ষতা ও অপচয়ের দায় জনগণের করের টাকায় অনির্দিষ্টকাল বহন করতে হবে না।
লেখক: প্রকৌশলী, সদস্য- এ্যাব
কেকে/ এমএস