গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ এখন সাত মাস পেরিয়ে গেছে, অথচ এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছেন যে, নির্বাচনের ঠিক পরপরই এই যুদ্ধের অবসান ঘটবে, কারণ তার ভাষায় ইরান ‘আর বেশিদিন টিকতে পারবে না’।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে যুদ্ধ তিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তা এখন নভেম্বরের ৩ তারিখের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে রাজনৈতিক এক বড় বোঝায় পরিণত হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প ইরানের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ‘সাহায্য আসছে’।
বোমাবর্ষণ শুরুর পর লক্ষ্য বদলে গিয়ে দাঁড়ায় তেহরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং এক দিনের মধ্যেই তার সঙ্গে যুক্ত হয় শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য। আগস্টে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আরেকটি অগ্রাধিকার-তালিকা হাজির করেন, যেখানে আমেরিকানদের জন্য সস্তা তেল-গ্যাস নিশ্চিত করাকে ‘প্রথম লক্ষ্য’ ঘোষণা করে ইরানের পারমাণবিক প্রশ্নকে দ্বিতীয় স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি সম্প্রতি ভ্যান্স এই সংঘাতকে ‘যুদ্ধ’ বলতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যদিও ইরান ইতোমধ্যে কুয়েতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বান্দার আব্বাস, আহভাজ, আগাজারি ও সিরিকে মার্কিন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে।
বারবার পরিবর্তিত এই যুক্তির কারণে যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য জনগণের কাছে ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে— আর এই স্পষ্টতার অভাবই এখন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান পার্টির জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা।
যুদ্ধের সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে জ্বালানি তেলের বাজারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হয়, এবং ইরান সেখানে নিষিদ্ধ অঞ্চল সম্প্রসারণ করে ১০টি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে বলে বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাব এল-মান্দেব প্রণালির কাছে হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রগতি, ফলে তেহরানের হাতে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডরের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ম্যাসাচুসেটস অ্যামহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী, ৮০ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও মুদিপণ্যের দাম বেড়েছে। এই ধারণা সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে ভোটের অঙ্কেও। রয়টার্স/ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে সাধারণ কংগ্রেসনাল ব্যালটে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে ৪৪-৩৭ শতাংশ ব্যবধানে এগিয়ে আছে।
মার্কিন রাজনৈতিক পূর্বাভাসদাতা প্রতিষ্ঠান ‘রেস টু দ্য হোয়াইট হাউস’ জানিয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস) দখলে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা এখন ৮৪ শতাংশ, আর সিনেটে তা ৬৮ শতাংশেরও বেশি। যুদ্ধ শুরুর সময় রিপাবলিকানদের সিনেট ধরে রাখার সম্ভাবনা ছিল ৭৭ শতাংশ— অর্থাৎ কয়েক মাসের মধ্যেই এই পূর্বাভাসে বিশাল পরিবর্তন ঘটে গেছে।
এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ট্রাম্পের নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি ‘মাগা’ আন্দোলনের ভেতরে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে উঠেছিল এই ধারণার ওপর যে ‘মহান জাতিরা অন্তহীন যুদ্ধে লিপ্ত হয় না’। তার সমর্থকগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবেই দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি সংঘাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার। অথচ এখন তাদেরই যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য বহন করতে হচ্ছে, এমন এক বয়ানের অনুপস্থিতিতে যা এই ত্যাগকে যৌক্তিক করে তুলতে পারে। সামরিক পর্যায়েও ক্লান্তির লক্ষণ স্পষ্ট। ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন জাহাজের এক নাবিক মানসিক স্বাস্থ্যজনিত কারণে আগস্টে সাগরে নিখোঁজ হয়ে যান। এছাড়া ইরানি প্রতিশোধমূলক হামলায় মার্কিন সেনা হতাহতের সংখ্যা যুদ্ধের সরকারি হিসাব থেকে চুপচাপ বাদ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, আর হরমুজ উপকূলের কাছে এক বিয়ের অনুষ্ঠানে মার্কিন হামলায় বেসামরিক প্রাণহানির অভিযোগও করেছে ইরান।
নির্বাচনে জয়ী হলে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ থামাতে কতটা সক্ষম হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তাদের ইতোমধ্যে যুদ্ধবিরোধী তৎপরতার প্রমাণ আছে। সংখ্যালঘু অবস্থানে থেকেও সিনেট ডেমোক্র্যাটরা এক ডজনেরও বেশি ওয়ার পাওয়ারস রেজল্যুশন ভোট আদায় করে নিয়েছেন। হাউসে সাতজন রিপাবলিকান সদস্য গত সপ্তাহে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে ২২০-২০৪ ভোটে এক প্রস্তাব পাস করান, যাতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়— এটি এই ধরনের তৃতীয় প্রস্তাব।
তবে প্রকৃত ক্ষমতা নিহিত আছে কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতায়। জুলাইয়ে হাউস ৯৫ বিলিয়ন ডলারের এক বাজেট কাঠামো অনুমোদন করে, যার মধ্যে ইরান যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা ব্যয়ের জন্য প্রায় ৭৩ বিলিয়ন ডলার নির্ধারিত। এই প্রস্তাব হাউসে পাস হয়েছিল মাত্র ২১৬-২১৪ ভোটে— অর্থাৎ আর একজন রিপাবলিকান সদস্য পক্ষ পরিবর্তন করলেই তা ভেস্তে যেত। জুনের শুরুতে চারজন হাউস রিপাবলিকান এবং মাসের শেষে চারজন সিনেট রিপাবলিকান ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে যোগ দিয়ে যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাবে ভোট দিয়েছিলেন, যা দেখায় রিপাবলিকান শিবিরেও ফাটল স্পষ্ট। নভেম্বরের নির্বাচনে রিপাবলিকানরা হেরে গেলেও ক্ষমতা হস্তান্তর সঙ্গে সঙ্গে হবে না— নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি, তার আগ পর্যন্ত চলবে ‘লেম-ডাক’ অধিবেশন।
পেন্টাগনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান যুদ্ধের অর্থায়ন পরিকল্পনা ডিসেম্বরের আগে চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই, এবং ২০২৭ অর্থবছরের বাজেট সিদ্ধান্ত নতুন বছরেও গড়াতে পারে। এর অর্থ, রিপাবলিকানদের হাতে হয়তো মাত্র চার সপ্তাহ সময় থাকবে এই বিতর্কিত অর্থায়ন নিশ্চিত করার জন্য, তাও যখন হাউসের ব্যবধান কার্যত একটি মাত্র ভোটের ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্লেষকরা ১৯৭৩ সালের ভিয়েতনাম যুদ্ধের নজিরও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, যখন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের চাপে বোমাবর্ষণ বন্ধের সময়সীমা মেনে নিতে হয়েছিল, কারণ যুদ্ধবিরোধী শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল সরকারের অপরিহার্য ব্যয় বরাদ্দ আইনের সঙ্গেই। ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস চাইলে একই কৌশলে ইরান যুদ্ধের জন্য নতুন কিংবা আগে বরাদ্দকৃত অব্যবহৃত তহবিল ব্যবহারে বাধা দিতে পারে, যা ট্রাম্পকে কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখে ফেলবে— পুরো সরকারি অর্থায়ন আটকে দেওয়া নাকি যুদ্ধ তহবিলে ছাড় দেওয়া।
তেহরান স্পষ্টতই এই রাজনৈতিক ফাটলের সুযোগ নিতে চাইছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজিত করতে পারবে না, কিন্তু যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে রেখে তারা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান মোহসেন রেজায়ি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা না ফেরা পর্যন্ত তেহরান নতুন কোনো পদক্ষেপ নেবে না। বিপ্লবী গার্ডের মুখপাত্র হোসেইন মোহেবিও যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার ও প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত ইরানি সম্পদ মুক্তির দাবি জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধ সামরিক ময়দানে যতটা না নিষ্পত্তি হবে, তার চেয়ে বেশি নির্ধারিত হতে পারে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ময়দানে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, স্পষ্ট লক্ষ্যহীনতা, এবং যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত বয়ান— এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে ট্রাম্পের নিজস্ব ভোটারদের মধ্যেই অসন্তোষ তৈরি করছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যদি সত্যিই রিপাবলিকানদের বিপক্ষে যায়, তবে তা শুধু কংগ্রেসের আসন বিন্যাসই বদলাবে না, বরং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও রাজনৈতিক সমর্থনের ভিত্তিকেও নড়বড়ে করে দিতে পারে।
লেখক : সহ-সম্পাদক, দৈনিক খোলা কাগজ
কেকে/এআই