বিশ্বের রাজনীতি কি বদলে যাচ্ছে? একসময় আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় সিদ্ধান্তগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান ছিল। এখন সেই চিত্রে যুক্ত হয়েছে চীন, ভারত, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার একাধিক শক্তিকেন্দ্র। বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য বদলাচ্ছে, প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা তীব্রতর হচ্ছে, বাণিজ্য-উত্তেজনা বাড়ছে, আর যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব সীমান্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এমন এক সময়ে ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হলো ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। সম্মেলন শেষ হয়েছে, ঘোষণাপত্রও এসেছে। কিন্তু সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়তো ঘোষণাপত্রের কোনো একটি সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হয়েছে, সেটি হলো— বিশ্ব কি এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে বহুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে?
১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ব্রিকসের ১১ সদস্য দেশের নেতারা অংশ নেন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকার পুরোনো কাঠামো এখন মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে অনেক বড় হয়েছে। ফলে ব্রিকস এখন আর শুধু কয়েকটি উদীয়মান অর্থনীতির সহযোগিতামঞ্চ নয়; এটি এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোকে একই আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসা একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত জনসংখ্যা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক এবং ক্রয়ক্ষমতার সমতায় (পিপিপি) বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তাদের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ। তাই ব্রিকসকে উপেক্ষা করার সুযোগ এখন আর নেই।
তবে ব্রিকসকে বোঝার ক্ষেত্রে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। ব্রিকস কোনো সামরিক জোট নয়। এটি ন্যাটোর মতো কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোও নয়। আবার এটিকে শুধু ‘যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী জোট’ বলাও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেই নানা বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ আছে, রাশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক তীব্রভাবে সংঘাতপূর্ণ, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বৈরী, আবার ব্রিকসেরই সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ভারত একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর। অর্থাৎ বর্তমান বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখলে বাস্তবতাকে বোঝা কঠিন হবে।
ভারতের এবারের সভাপতিত্বের একটি বড় বার্তা ছিল গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের ভূমিকা বাড়ানো। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বৈশ্বিক দক্ষিণকে শুধু অন্যের তৈরি নিয়ম অনুসরণকারী ‘রুল-টেকার’ হয়ে থাকলে চলবে না; তাকে ‘রুল-শেপার’ হতে হবে। কথাটি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব প্রশ্ন। বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিষ্ঠানগুলো কি সেই পরিবর্তনকে যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত করছে?
নয়াদিল্লি ঘোষণায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি আবারও জোরালোভাবে এসেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ও বাণিজ্যব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। ব্রিকসের এই অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব আছে। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার অনেক প্রতিষ্ঠান আজকের বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এমন অভিযোগ বহুদিনের। কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়— প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি করা আর সেই সংস্কার বাস্তবে ঘটানো কি এক বিষয়? নিশ্চয়ই নয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার দীর্ঘদিনের আলোচনা। শুধু ব্রিকসের সমর্থনেই সেটি হয়ে যাবে না। তাই ব্রিকসের ঘোষণাকে সম্ভাবনার জায়গা থেকে দেখতে হবে, নিশ্চিত পরিবর্তন হিসেবে নয়।
ডি-ডলারাইজেশন কতটা বাস্তব?
ব্রিকসের এবারের সম্মেলনে অর্থনৈতিক বিষয়গুলোও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তি এবং আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্রিকস পেমেন্ট টাস্ক ফোর্স আন্তঃসীমান্ত পেমেন্টব্যবস্থার কার্যকারিতা উন্নয়নে কাজ করছে; একইসঙ্গে পেমেন্ট ও মেসেজিং চ্যানেলগুলোর আন্তঃসংযোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নিষ্পত্তির বিষয়টিও এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এখানেই ডি-ডলারাইজেশনের প্রসঙ্গ আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যেন ব্রিকস একটি অভিন্ন মুদ্রা চালু করে ফেলেছে এবং ডলারের পতন এখন সময়ের ব্যাপার। বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ব্রিকস কোনো অভিন্ন মুদ্রা চালু করেনি; বরং সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সীমান্তপারের লেনদেন সহজ করার চেষ্টা চলছে। ঘোষণাপত্রেও ‘একটি মুদ্রা’ তৈরির সিদ্ধান্ত নেই; বরং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং পেমেন্টব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কি ডলারের গুরুত্ব কমবে না? কমতে পারে যদি স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং বিকল্প অর্থায়ন কার্যকরভাবে বিস্তৃত হয়। কিন্তু ডলারের বৈশ্বিক প্রভাব রাতারাতি শেষ হয়ে যাবে এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈশ্বিক আর্থিক বাজার, রিজার্ভ ব্যবস্থা, ব্যাংকিং অবকাঠামো এবং বিনিয়োগে ডলারের অবস্থান এখনো অত্যন্ত শক্তিশালী। তাই ‘ডলার শেষ’ বলা যেমন অতিরঞ্জন, তেমনি ‘ডলারের বিকল্প তৈরির কোনো চেষ্টা হচ্ছে না’ বলাও ভুল।
বরং বিষয়টিকে এভাবে দেখা যায়— বিশ্বের কিছু দেশ নিজেদের অর্থনৈতিক লেনদেনে একক কোনো ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। এটি শুধু ব্রিকসের বিষয় নয়; বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার একটি বড় প্রবণতা। অর্থনৈতিক সম্পর্ক যখন রাজনৈতিক চাপের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও বাড়ে। ব্রিকস সেই বিকল্প তৈরির একটি প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
এখানে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক বা এনডিবি-এর গুরুত্বও রয়েছে। ব্রিকসের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংক অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছে। এবারের ঘোষণায় এনডিবি-এর স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন বাড়ানো, অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক একই ভবনে ভূমিকা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ব্রিকস-এনডিবি নলেজ পোর্টাল চালুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য
বাংলাদেশের জন্য এই বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়, কিন্তু এনডিবি-এর সদস্য। ফলে ব্রিকসের অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সরাসরি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের অবকাঠামো, জ্বালানি, পরিবহন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রয়োজন বিবেচনায় এনডিবি-এর মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের জন্য ব্রিকসের গুরুত্ব শুধু এনডিবি-তে সীমাবদ্ধ নয়। ভারত, চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশ বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, শ্রমবাজার, অবকাঠামো ও কূটনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। ফলে ব্রিকসের ভেতরে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত বাড়বে, বাংলাদেশের জন্যও তত নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়লে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। এই জায়গায় বাংলাদেশের নীতি হওয়া উচিত আবেগ দিয়ে কোনো পক্ষ বেছে নেওয়া নয়; বরং নিজের স্বার্থকে সামনে রাখা। বাংলাদেশ কার পক্ষে— এই প্রশ্নের চেয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়, এই প্রশ্নটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোন দেশ থেকে বিনিয়োগ পাওয়া যাবে, কোন বাজারে রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব, কোথা থেকে প্রযুক্তি ও জ্বালানি সহযোগিতা পাওয়া যাবে, কিভাবে উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি করা যায়— এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই হচ্ছে আমাদের কূটনৈতিক বাস্তবতা।
নয়াদিল্লি সম্মেলনের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিকস এখন শুধু রাষ্ট্রপ্রধানদের বৈঠকের সংগঠন হয়ে থাকতে চাইছে না; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ব্রিকস ইকোনমিক পার্টনারশিপ ২০৩০-এর অগ্রগতি, নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগ, ব্রিকস রিস্ক ল্যাব, সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো, শিল্প ও উদ্ভাবন— এসব ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে এআই-এর বিষয়টি ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনের অর্থনৈতিক শক্তি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ বা জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করবে না; প্রযুক্তি, ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, সাইবার সক্ষমতা ও জ্ঞান উৎপাদনের ক্ষমতাও রাষ্ট্রের শক্তি নির্ধারণ করবে। ফলে গ্লোবাল সাউথ-এর দেশগুলো যদি প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হয়েই থাকে, কিন্তু প্রযুক্তির নিয়ম তৈরির অংশীদার হতে না পারে, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্যের নতুন রূপ তৈরি হতে পারে। ব্রিকসের প্রযুক্তি সহযোগিতার আলোচনার গুরুত্ব এখানেই।
তবে ব্রিকস যত বড় হচ্ছে, তার ভেতরের বৈচিত্র্যও তত বড় হচ্ছে। আর এখানেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ভারত ও চীনের সম্পর্ক তার একটি বড় উদাহরণ। নয়াদিল্লি সম্মেলনের আগে ও সম্মেলনের সময় মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। কয়েক বছর ধরে সীমান্ত উত্তেজনা ও অবিশ্বাসের পর উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি বৈঠক মানেই ভারত-চীন সম্পর্কের সব সমস্যা শেষ হয়ে গেছে এমনটা বলার সুযোগ নেই। সীমান্ত বিরোধ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক প্রভাব ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনো দুই দেশের সম্পর্কের বাস্তব অংশ।
ব্রিকস কি বিকল্প ব্যবস্থা?
তাহলে প্রশ্ন হলো— ব্রিকস কি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব এখনো অনেক বড়। সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, আর্থিক বাজার, বৈশ্বিক মিত্রতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করা সহজ নয়। একইসঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক শক্তি, ভারতের উত্থান, রাশিয়ার সামরিক ও জ্বালানি সক্ষমতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক গুরুত্বও অস্বীকার করা যায় না।
এই জায়গায় ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং দুর্বলতা একই জায়গায়— এর বৈচিত্র্য। বৈচিত্র্যের কারণে এটি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের দেশকে এক জায়গায় আনতে পারে। আবার সেই বৈচিত্র্যের কারণেই সব বিষয়ে একমত হওয়া কঠিন। ঘোষণাপত্রে অনেক বিষয় একসঙ্গে রাখা সম্ভব, কিন্তু বাস্তব নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে সদস্য দেশগুলোর স্বার্থের পার্থক্য সামনে চলে আসবে। তাই ব্রিকসের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ঘোষণাপত্রের শব্দ নয়, বাস্তব কাজ। স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য কতটা বাড়ে, ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট কতটা কার্যকর হয়, এনডিবি কতটা অর্থায়ন করতে পারে, নতুন বিনিয়োগ উদ্যোগ কতটা বাস্তব ফল দেয়, এআই ও প্রযুক্তি সহযোগিতা কতটা এগোয়, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য কতটা বাড়ে এবং গ্লোবাল সাউথ-এর দাবিগুলো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে— এসব প্রশ্নের উত্তরই ব্রিকসের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারণ করবে।
আর বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে এমন একটি বিশ্ব তৈরি হচ্ছে, যেখানে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ভারত আমাদের প্রতিবেশী ও বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। চীন বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন সহযোগী। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য সম্পর্ক রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। এনডিবি-এর সদস্য হিসেবেও বাংলাদেশের একটি সরাসরি সংযোগ আছে। তাই ব্রিকসকে শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি খবর হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কূটনীতির সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আমাদের সামনে প্রশ্ন হওয়া উচিত— এই পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করবে? আমরা কি শুধু বড় দেশগুলোর সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকব, নাকি নিজেদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়াব?
সবশেষে ফিরে আসা যাক মূল প্রশ্নে— ব্রিকস কি বিশ্বব্যবস্থা বদলাচ্ছে? এখনই বলা যাবে না যে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করে ফেলেছে। এমন দাবির পক্ষে বাস্তব প্রমাণ নেই। কিন্তু এটাও বলা যাবে না যে কিছুই বদলাচ্ছে না।
ব্রিকসের সম্প্রসারণ, গ্লোবাল সাউথ-এর প্রতিনিধিত্বের দাবি, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের চেষ্টা, বিকল্প অর্থায়ন, নতুন পেমেন্টব্যবস্থা, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি— সব মিলিয়ে একটি পরিবর্তনের প্রবণতা স্পষ্ট। সম্ভবত আমরা এমন একটি বিশ্বে প্রবেশ করছি, যেখানে একক কোনো শক্তি সব ক্ষেত্রের নিয়ম একা নির্ধারণ করতে পারবে না। তবে সেই বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব কতটা ন্যায্য হবে, কতটা স্থিতিশীল হবে এবং ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সেখানে কতটা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে— সেটিই হবে আসল পরীক্ষা।
ব্রিকস সেই নতুন বিশ্বের নির্মাতা কি না, সময়ই তার উত্তর দেবে। কিন্তু ব্রিকস যে একটি বদলে যাওয়া বিশ্বের লক্ষণ, তা আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আর বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি ব্রিকসের সদস্য হওয়া না হওয়া নয়। প্রশ্ন হলো— বিশ্ব যখন নিজের ভারসাম্য বদলাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ কি শুধু দর্শক হয়ে থাকবে, নাকি নিজের স্বার্থ, সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকেও প্রস্তুত করবে? কারণ বিশ্বব্যবস্থা বদলালে সুযোগও আসে, ঝুঁকিও আসে। কিন্তু সুযোগকে কাজে লাগাতে হলে শুধু পরিবর্তন দেখতে হয় না, পরিবর্তনকে বুঝতেও হয়।
লেখক : গবেষক
কেকে/এআই