শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১১ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● জনপ্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে সরকার কঠোর হতে বাধ্য হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● প্রথম দফায় বাদ পড়া শিশুদের জন্য দ্বিতীয় দফায় হাম টিকাদান শুরু      ● আওয়ামী লীগের দোসরদের আইনের আওতায় আনলে পুরস্কার : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী      ● সোনা-রূপার দাম কমাল বাজুস      ● সোনারগাঁয়ে ট্রলারডুবি: নিখোঁজ পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার      ● নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রীর ৩০ কর্মসূচি, ১১ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক      ● অপ্রতিমকে নিয়ে ফেসবুকে অপপ্রচার, নিরাপত্তা চেয়ে বাবার জিডি      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
এআইয়ের অগ্রযাত্রা: সম্ভাবনা ও ঝুঁকি
উম্মে হাবিবা শান্তা
প্রকাশ: শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৪৯ পিএম
ছবি: খোলা কাগজ

ছবি: খোলা কাগজ

এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কল্পনার বিষয় নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ঘুম ভাঙার পর আবহাওয়ার খবর জানা থেকে শুরু করে অনলাইনে কেনাকাটা, ব্যাংকের কাজ, গাড়ি চালানো, পথ চেনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সর্বত্রই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজ করছে। এটি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, তবে এর পাশাপাশি নৈতিক ও সামাজিক নানা জটিলতাও তৈরি করেছে। তাই এই প্রযুক্তির ভালো ও মন্দ দিক দুটো নিয়েই গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।

শিক্ষার ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। একসময় ভালো শিক্ষক পেতে শহরে ছুটতে হতো কিংবা প্রাইভেট পড়ার পেছনে অনেক টাকা খরচ করতে হতো। এখন হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন দিয়েই যেকোনো শিক্ষার্থী গণিত, বিজ্ঞান এবং ইংরেজি শিখতে পারছে। এই প্রযুক্তি কখনো ক্লান্ত হয় না, বরং একই বিষয় বারবার বুঝিয়ে দিতে পারে। ফলে শহর আর গ্রামের শিক্ষার যে বিশাল তফাৎ ছিল, তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। ভাষা শেখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। মুহূর্তের মধ্যে অনুবাদ করা, ভুল বানান ও ব্যাকরণগতভাবে ঠিক করে দেওয়া, উচ্চারণ ঠিক করে দেওয়া এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে।

চিকিৎসা খাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। হাসপাতালে এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ও এমআরআইয়ের ছবি বিশ্লেষণ করে রোগ নির্ণয়ের ভুল অনেক কমে গেছে। ক্যানসারের মতো মরণব্যাধি এখন শুরুর দিকেই ধরা পড়ছে। জটিল রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এই প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন। নতুন ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণাও আগের চেয়ে অনেক দ্রুত হচ্ছে। দূর থেকে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার মাধ্যমে গ্রামের মানুষও ঘরে বসে প্রাথমিক পরামর্শ ও রোগ নির্ণয়ের সুযোগ পাচ্ছে। এতে মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।

কৃষিতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে। আকাশ থেকে তোলা ছবি, মাটির নিচের সেন্সরের মাধ্যমে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এই প্রযুক্তি কৃষককে জানিয়ে দিচ্ছে কখন জমিতে পানি দিতে হবে, কতটুকু সার লাগবে, কোন ফসল চাষ করলে লাভ বেশি হবে এবং পোকার আক্রমণ কখন হতে পারে। এর ফলে ফসলের ফলন বাড়ছে এবং কৃষকের লোকসান কমছে। বাংলাদেশের মতো কৃষির ওপর নির্ভরশীল দেশের জন্য এটি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া যোগাযোগ, ব্যাংকিং, পরিবহন, অনলাইন বেচাকেনা ও কলকারখানায়ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উৎপাদন বাড়িয়েছে। দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা গ্রাহকসেবা, ব্যাংকে জালিয়াতি ধরা, তথ্যের নিরাপত্তা রক্ষা এবং যন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত কাজ করা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে এই প্রযুক্তি আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, খরচ কমাচ্ছে এবং কঠিন কাজকে সহজ করে দিচ্ছে।

কিন্তু আলোর পাশেই অন্ধকার থাকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো চাকরি হারানোর আশঙ্কা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তির কারণে সারা বিশ্বে প্রায় ৮ কোটি ৫০ লাখ মানুষের চাকরি চলে যেতে পারে। ব্যাংকের হিসাবরক্ষক, গ্রাহকসেবা দেওয়া, তথ্য লেখার কাজ, অনুবাদ ও সাধারণ নকশার কাজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। যার ফলে জনবহুল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেকারত্বের হার আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরেকটি বড় সংকট হলো তথ্যের সত্যতা ও নৈতিকতা নিয়ে। নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন যে কারও চেহারা ও গলার স্বর নকল করে মিথ্যা ভিডিও ও শব্দ তৈরি করা যাচ্ছে। এর মাধ্যমে সমাজে অস্থিরতা, মানুষকে ছোট করা, প্রতারণা ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন আসল ও নকলের পার্থক্য করতে হিমশিম খাচ্ছে।

এ ছাড়া এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে আমাদের নিজেদের চিন্তা করার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়ির কাজ, এমনকি গবেষণার কাগজও এই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করে নিচ্ছে। এতে তাদের নিজস্ব বিশ্লেষণ ও নতুন কিছু তৈরির ক্ষমতা নষ্ট হচ্ছে।

তথ্যের নিরাপত্তাও এখন চিন্তার বিষয়। এই প্রযুক্তির নানা অ্যাপে আমরা ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি ও ব্যাংকের হিসাব দিচ্ছি; সেগুলো কোথায় যাচ্ছে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতে মানুষের গোপনীয়তা নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া পক্ষপাতযুক্ত তথ্য দিয়ে তৈরি প্রযুক্তি অনেক সময় ভুল ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে যেমন বড় সুযোগ, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও বটে। দেশের তরুণ প্রজন্মকে যদি সঠিকভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে তারা অনলাইনে কাজ, সফটওয়্যার তৈরি ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেশে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারবে। সরকারি কাজকর্মকে সহজ করা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা, রাস্তার যানজট কমানো ও দুর্নীতি ঠেকাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে অনেক সাশ্রয় করা সম্ভব।

কিন্তু আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল এবং কারিগরি শিক্ষার হার খুবই কম। আরেকটি বড় সমস্যা হলো ডিজিটাল বৈষম্য। শহরের মানুষ দ্রুতগতির যোগাযোগব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতির কারণে অনেক এগিয়ে যাবে। কিন্তু গ্রামের মানুষ পিছিয়ে পড়লে দেশের ভেতরেই বৈষম্য আরও বাড়বে।

তাই এখন আমাদের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ওপর। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটারের ভাষা শেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, তথ্যের নিরাপত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানা যন্ত্র ব্যবহার শেখাতে হবে। সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করে তরুণদের এই প্রযুক্তি সম্পর্কে জ্ঞানী করে তুলতে হবে। মিথ্যা ভিডিও, তথ্য চুরি ও প্রতারণা ঠেকাতে কঠোর আইন ও নৈতিক নিয়ম তৈরি করতে হবে।

এই প্রযুক্তি আমাদের শুধু তথ্য দেবে, কিন্তু শেষ সিদ্ধান্ত সবসময় মানুষকেই নিতে হবে। তাই এআই যেন আমাদের ব্যবহার ও ঝুঁকি সৃষ্টি না করতে পারে, বরং এআইকে সঠিক মাধ্যমে ব্যবহার করে আমাদের কাজকে আরও উন্নত এবং সহজ করে তুলতে হবে। এআইয়ের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমেই দেশ আরও সমৃদ্ধ এবং উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে সক্ষম হবে।

লেখক: কলামিস্ট


কেকে/সাশ 



আরও সংবাদ   বিষয়:  এআই   সম্ভাবনা ও ঝুঁকি  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close