কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে এক কিশোরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করেছে পুলিশ—এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি সারা দেশে বিস্তৃত এক কাঠামোগত সংকটের একটি স্থানিক প্রতিচ্ছবি মাত্র। কুমিল্লা নগরীতেই গত আট বছরে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে, আর সক্রিয় দলের সংখ্যা তিন-চার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত বিশে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ২৩৭টি, যার মোট সদস্য অন্তত ৫০ হাজার। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে এই সংখ্যা ছিল ১২৭টি, যা রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, দেশে বর্তমানে মোট অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশের সঙ্গে কিশোর অপরাধীরা জড়িত—ছিনতাই, অপহরণ, খুন, মাদক কারবার, দখলবাজি থেকে শুরু করে ইভ টিজিং পর্যন্ত। এই পরিসংখ্যানের আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা আরও ভয়ংকর। প্রকাশ্য দিবালোকে প্রতিপক্ষ গ্যাংয়ের হাতে কুপিয়ে হত্যা, থানার প্রধান ফটক ভেঙে আটক কিশোরদের বেরিয়ে যাওয়া, কিংবা নিরীহ পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে অভিভাবকের প্রাণহানি—এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, সমস্যাটি আর নিছক ‘কিশোর অপরাধ’ পর্যায়ে নেই; এটি সংগঠিত অপরাধচক্রে রূপান্তরিত হয়েছে, যার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা।
খোলা কাগজের প্রতিবেদন অনুযায়ী রাজনৈতিক নেতারা এই কিশোরদের লালন-পালন করেন, ব্যবহার করেন এলাকা দখল ও প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে। নির্বাচনের পর স্থানীয় রাজনীতিকদের আশ্রয় পাওয়ার চেষ্টায় থাকা গ্যাংগুলোর প্রবণতা এ কথারই সাক্ষ্য দেয়। যত দিন এই আশ্রয়-প্রশ্রয়ের সংস্কৃতি বহাল থাকবে, তত দিন শুধু থানা-পুলিশের অভিযান দিয়ে এই সংকট মেটানো অসম্ভব—কারণ গ্রেপ্তার হওয়া কিশোরেরা কিছুদিন পরই জামিনে মুক্তি পেয়ে আবার একই বৃত্তে ফিরে আসছে।
ভারতে জাতীয় অপরাধ রেকর্ড ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য-বিশ্লেষকেরা দেখাচ্ছেন, নগর বস্তিতে বেড়ে ওঠা কিশোরেরা প্রায়ই পরিচয় ও গোষ্ঠীবদ্ধতার সন্ধানে গ্যাং সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে অপরিকল্পিত নগরায়ণ শিক্ষা ও পারিবারিক সুরক্ষার ঘাটতি তৈরি করেছে। দিল্লিতে পুলিশকে “অপারেশন গ্যাং বাস্ট”-এর মতো ব্যাপক অভিযান চালিয়ে শত শত কিশোর-তরুণ গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে হয়েছে—বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কুমিল্লা অভিযানের সঙ্গে যার মিল স্পষ্ট।
পাকিস্তানে করাচির মতো মহানগরে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও বেকারত্ব তরুণ প্রজন্মকে অপরাধচক্রের সহজ শিকারে পরিণত করেছে। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে শহরমুখী হওয়া বেকার তরুণদের মধ্যে থেকেই অপরাধী গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মোবাইল ছিনতাই, গাড়ি চুরি ও মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধে করাচিতে প্রতিদিনই শত শত ঘটনা নথিভুক্ত হচ্ছে। এই তিন দেশের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে দেখলে একটি সাধারণ প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়ে ওঠে—দ্রুত নগরায়ণ, বস্তি-কেন্দ্রিক দারিদ্র্য, শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার মহিমান্বিত রূপায়ণ, দুর্বল ও ধীরগতির বিচারব্যবস্থা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। পার্থক্য শুধু মাত্রায়, প্রকৃতিতে নয়। আমরা মনে করি, কিশোর গ্যাং সমস্যা মোকাবিলায় পুলিশি অভিযানকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে একটি সামগ্রিক, বহুমুখী কৌশল গ্রহণ করা জরুরি।
যেসব রাজনৈতিক নেতা-কর্মী কিশোর গ্যাংকে আশ্রয় দেন, তাদের বিরুদ্ধে দলীয় পরিচয়নির্বিশেষে আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। গ্রেপ্তারের পর সহজ জামিনে মুক্তি পেয়ে পুনরায় অপরাধে জড়ানোর চক্র ভাঙতে কিশোর আদালতের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে।
শুধু আটক-গ্রেপ্তার নয়, কাউন্সেলিং, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কিশোরদের মূলধারায় ফেরানোর কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। অভিভাবক, শিক্ষক ও এলাকার মুরব্বিদের সম্পৃক্ত করে সন্তানের গতিবিধি, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে।
বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায় শিক্ষা, বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন থেকে কিশোরদের দূরে রাখতে হবে। রাষ্ট্র, রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পরিবার—সবাইকে একযোগে দায়িত্ব নিতে হবে, নইলে আজকের কিশোর গ্যাং আগামী দিনের সংগঠিত সন্ত্রাসে রূপ নেবে, যা রুখতে তখন আরও অনেক বড় মূল্য দিতে হবে।
কেকে/সাশ