দুই বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে বিশ্ব একটি শিক্ষা নিয়েছিল- শক্তিশালী রাষ্ট্রের ইচ্ছাই যদি আন্তর্জাতিক রাজনীতির শেষ কথা হয়, পৃথিবী কখনো নিরাপদ হবে না। সেই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় জাতিসংঘ, জাতিসংঘ সনদ, আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন এবং জেনোসাইড প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশন। এর ভিত্তি ছিল একটি ন্যূনতম ঐকমত্য: কোনো রাষ্ট্র কেবল শক্তির জোরে অন্য রাষ্ট্রের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে পারবে না; আগ্রাসন ও বলপ্রয়োগ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক উপায় হতে পারে না।
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ অন্য রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বা রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে শক্তির হুমকি বা শক্তি প্রয়োগ নিষিদ্ধ করেছে। আত্মরক্ষার অধিকার এবং নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদিত ব্যবস্থা এই কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম। অর্থাৎ ‘জাতীয় স্বার্থ’ নিজে যুদ্ধের স্বয়ংক্রিয় আইনি অনুমতি নয়। শক্তির বদলে আইনকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি করাই ছিল জাতিসংঘ-পরবর্তী বিশ্বের প্রধান অঙ্গীকার।
কিন্তু ২২ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য সেই ন্যূনতম ঐকমত্য নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, “to the victor belong the spoils” ; ইরানের প্রসঙ্গে বলেছেন, তার সামনে চুক্তি অথবা ইসলামিক রিপাবলিককে ‘annihilate’ করার বিকল্প রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, তাদের ‘no chance of survival’ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো আশা না রাখার কথা।
প্রশ্নটি তাই শুধু ট্রাম্পের ভাষা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো- জাতিসংঘের মঞ্চেই যদি শক্তিধর রাষ্ট্রের ভাষায় যুদ্ধ, বিজয়ীর লুট এবং একটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন কোথায় দাঁড়ায়?
ভেনেজুয়েলার প্রসঙ্গটি প্রথমে দেখা যাক। ট্রাম্প তার ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদ নিয়ে করা চুক্তির প্রসঙ্গে বলেন, “to the victor belong the spoils” একই বক্তব্যে তিনি জানান, পশ্চিম গোলার্ধে মার্কিন স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র তার unmatched military might ব্যবহার করবে।
এখানে আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক প্রশ্নটি সরল। কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করলেই তার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ বৈধ হয়ে যায় না। জাতিসংঘ সনদের কাঠামোতে আত্মরক্ষার অধিকার নির্দিষ্ট শর্তের সঙ্গে যুক্ত; আর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন একটি পৃথক আইনি পথ। ‘জাতীয় স্বার্থ’ আলাদা কোনো যুদ্ধ-অনুমতি নয়।
‘বিজয়ীর লুট’ ধারণাটিও আধুনিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুদ্ধ জিতলেই পরাজিত রাষ্ট্রের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিজয়ী রাষ্ট্রের মালিকানা তৈরি হয়- এমন কোনো সাধারণ নীতি আধুনিক আন্তর্জাতিক আইন স্বীকার করে না। ১৯০৭ সালের হেগ বিধিতে লুটপাট নিষিদ্ধ করা হয়েছে; ১৯৬২ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১৮০৩ নম্বর প্রস্তাবে জনগণ ও জাতির নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থায়ী সার্বভৌমত্বের নীতি স্বীকৃত হয়েছে।
অর্থাৎ যে বিশ্বব্যবস্থা উপনিবেশ, দখল ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল, সেখানে ‘বিজয়ীর লুট’ নিছক একটি বাক্য নয়। এটি শক্তির পুরোনো রাজনীতিকে নতুন ভাষায় ফিরিয়ে আনার আশঙ্কা তৈরি করে।
এরপর ইরান। ট্রাম্প তার ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দেন এবং বলেন, তার সামনে একটি ‘big decision’ -চুক্তি, যাতে ইরান পুনর্গঠন করতে পারে; অথবা ইসলামিক রিপাবলিককে দ্রুত ‘annihilate’ করা। এরপর তিনি প্রশ্ন করেন, তাদের কি ‘no chance of survival’ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কোনো আশা না রেখে ‘hell’-এর দিকে ঠেলে দেওয়া হবে? সমসাময়িক প্রতিবেদনে তার এই বক্তব্যের পূর্ণ উদ্ধৃতিও প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা জরুরি। প্রথমত, কোনো রাষ্ট্রের সরকার বা রাজনৈতিক ব্যবস্থা কী হবে, তার মূল সিদ্ধান্ত সেই দেশের জনগণের রাজনৈতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। জাতিসংঘ সনদের ১(২) অনুচ্ছেদে জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের নীতি স্বীকৃত। ১৯৮৬ সালের Nicaragua v. United States মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতও অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ ও বলপ্রয়োগের সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি স্পষ্ট করেছে।
দ্বিতীয়ত, ‘annihilate’ বা সম্পূর্ণ ধ্বংসের ভাষা। প্রশ্নের আকারে বলা হলেই কোনো ধ্বংসাত্মক বিকল্প আইনসম্মত হয়ে যায় না। বিশেষ করে যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় একটি দেশের মানুষের ‘survival’ এবং ‘future generations’-এর অস্তিত্বের কথা।
তবে এখানেই আইনি সতর্কতা সবচেয়ে জরুরি। কোনো বক্তব্যকে সরাসরি ‘জেনোসাইড’ হিসেবে চূড়ান্ত ঘোষণা করতে হলে জেনোসাইড কনভেনশনের নির্দিষ্ট উপাদান, বিশেষত কোনো জাতীয়, নৃগোষ্ঠীগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার বিশেষ অভিপ্রায়, প্রতিষ্ঠা করতে হয়। অতএব একটি বক্তব্যের ভিত্তিতে চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু বক্তব্যটি জেনোসাইড কনভেনশনের আলোকে গুরুতর প্রশ্ন অবশ্যই উত্থাপন করে- বিশেষ করে যখন একটি জনগোষ্ঠীর টিকে থাকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে ধ্বংসের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
এখানেই জাতিসংঘের আসল সংকট। জাতিসংঘ নিখুঁত প্রতিষ্ঠান নয়। নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থাই দেখায়, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার অসমতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও রয়েছে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও জাতিসংঘের ঐতিহাসিক অর্জন হলো- শক্তিকে অন্তত একটি আইনি কাঠামোর মধ্যে বেঁধে রাখার চেষ্টা।
সেই কাঠামো দুর্বল হলে প্রথম শিকার হবে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো। তখন শক্তিধর রাষ্ট্রের সামরিক অভিযান হয়ে উঠবে ‘জাতীয় স্বার্থ’; তার সম্পদগত স্বার্থ হয়ে উঠবে ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’; আর দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব হয়ে যাবে দর-কষাকষির বিষয়। বাংলাদেশসহ গ্লোবাল সাউথের রাষ্ট্রগুলোর জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে?
জাতিসংঘ ফুরিয়ে যায় ভবন ভেঙে পড়লে নয়; ফুরিয়ে যায় যখন তার সনদের নীতিগুলো শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর জন্য ঐচ্ছিক হয়ে ওঠে। পতাকা থাকবে, অধিবেশন হবে, বক্তৃতা চলবে। কিন্তু যুদ্ধের বৈধতা, সম্পদের মালিকানা এবং একটি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্ন যদি শেষ পর্যন্ত শক্তিই নির্ধারণ করে, তবে আন্তর্জাতিক আইন আর কতটা আইন থাকবে?
‘Might is right’ -শক্তিই অধিকার- এই পুরোনো দর্শনকে পরাজিত করতেই জাতিসংঘ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। আজ সেই দর্শন যদি জাতিসংঘের মঞ্চেই ফিরে আসে, বিপদ শুধু ইরান বা ভেনেজুয়েলার নয়। বিপদ সেই ন্যূনতম বিশ্বব্যবস্থার, যেখানে ছোট রাষ্ট্রও অন্তত বলতে পারে- আমাদের ওপর শক্তি প্রয়োগের আগে আইন আছে।
আইন যদি শক্তিধরের জন্য একরকম আর দুর্বলের জন্য আরেক রকম হয়, তবে শেষ পর্যন্ত আইন থাকে না; থাকে শুধু শক্তির ইচ্ছা।
লেখক: সাংবাদিক
কেকে/সাশ