জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খাতে তার প্রভাব পড়বে— এটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা। জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে গেলে পরিবহন ব্যবসার মোট খরচও বাড়তে পারে। কিন্তু সেই ব্যয়ের অজুহাতে সরকারি সিদ্ধান্ত বা অনুমোদিত ভাড়ার বাইরে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত অর্থ আদায় কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধির কারণে দেশের জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ব্যয়চাপ তৈরি হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে।
সরকারের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারের বাড়তি ব্যয় ও বিপিসির লোকসান বিবেচনায় নিয়ে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে— জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এর পুরো চাপ কি সাধারণ যাত্রীর ওপর ইচ্ছেমতো চাপিয়ে দেওয়া যাবে? তবে ২১ সেপ্টেম্বর দেশে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিন আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। ওই দিন ব্রেন্টের দাম ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ১৫ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ কমে ৯৮ দশমিক ৪৬ ডলারে নেমে আসে।
গণপরিবহনে ভাড়া নির্ধারণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বিষয়। কোন রুটে কত ভাড়া কার্যকর হবে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত কাঠামো অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়ার কথা। তাই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কোনো চালক, সহকারী বা পরিবহন মালিক নিজের মতো করে ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারেন না।
ধরা যাক, কোনো রুটে ১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এতে যাত্রীর ব্যয় একবারে ৫০ শতাংশ বেড়ে যায়। একইভাবে ১৫ টাকার ভাড়া ২০ টাকা হলে প্রতিদিন যাতায়াতকারী একজন মানুষের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একজনের কাছে কয়েক টাকা অতিরিক্ত নেওয়া সামান্য মনে হলেও প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রীর কাছ থেকে একইভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় হলে তা বড় ধরনের আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়। তাই জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে ভাড়া বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিলে তার জন্য নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যৌক্তিকতা যাচাই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা জনগণকে জানানো জরুরি।
ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত
গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্যের অন্যতম কারণ হলো ভাড়ার তথ্যের স্বচ্ছতার ঘাটতি। অনেক যাত্রী জানেন না নির্দিষ্ট গন্তব্যে অনুমোদিত ভাড়া কত। এই সুযোগেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রবণতা তৈরি হয়। প্রতিটি বাস, মিনিবাস ও অন্যান্য গণপরিবহনে সংশ্লিষ্ট রুটের অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করা উচিত। যাত্রী যেন গাড়িতে ওঠার আগেই বা ওঠার পর সহজে জানতে পারেন— কোন গন্তব্যে কত ভাড়া দিতে হবে। নতুন ভাড়া নির্ধারণ করা হলে পুরোনো তালিকা সরিয়ে সংশোধিত তালিকা দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এতে যাত্রী ও পরিবহনকর্মী—উভয়ের জন্যই নিয়ম স্পষ্ট থাকবে এবং অযথা বিতর্কের সুযোগ কমবে।
গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধির প্রভাব সমাজের সব শ্রেণির মানুষের ওপর সমানভাবে পড়ে না। প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিয়মিত যাতায়াতের ব্যয় পারিবারিক বাজেটের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য ব্যয়ের চাপের মধ্যে পরিবহন খরচও যদি অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে পরিবারের সামগ্রিক ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে :
গণপরিবহন ব্যবস্থায় শুধু যাত্রীর স্বার্থ বিবেচনা করলেই সমাধান হবে না। পরিবহন মালিকদের জ্বালানি, যন্ত্রাংশ, টায়ার, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ, কর ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় রয়েছে। একইভাবে চালক ও শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনযাত্রার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে যাত্রীদের সক্ষমতা ও জনস্বার্থের পাশাপাশি পরিবহন পরিচালনার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু ব্যয় বেড়েছে— এই যুক্তি দেখিয়ে অনুমোদনের বাইরে বাড়তি ভাড়া নেওয়া বৈধ হয়ে যায় না।
প্রকৃত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় করতে হবে। গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
তদারকি শুধু রাজধানী বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মহানগর, জেলা শহর, উপজেলা, মহাসড়ক এবং আন্তঃজেলা রুট— সব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি থাকা দরকার। অভিযানের সময় শুধু অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে কি না তা নয়, গাড়িতে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা আছে কি না, রুট অনুযায়ী ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না এবং অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না— এসব বিষয়ও দেখতে হবে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিয়ম সম্পর্কেও নিয়মিত সচেতন করতে হবে।
অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের শিকার হলেও অনেক যাত্রী জানেন না কোথায় অভিযোগ করবেন। কেউ কেউ ঝামেলা এড়াতে বাড়তি টাকা দিয়ে চলে যান। আবার অনেকে চালক বা সহকারীর সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যেতে চান না। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে সহজ ও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন। প্রতিটি গণপরিবহনে গাড়ির নম্বর, রুট এবং অভিযোগ জানানোর প্রয়োজনীয় তথ্য দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শন করা যেতে পারে।
অভিযোগের ক্ষেত্রে যাত্রীরা সম্ভব হলে গাড়ির নম্বর, রুট, সময়, গন্তব্য এবং আদায়কৃত ভাড়ার তথ্য সংরক্ষণ করতে পারেন। গণপরিবহন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। রুট পারমিট, যানবাহনের পরিচিতি, ফিটনেস এবং অন্যান্য তথ্যের পাশাপাশি অনুমোদিত ভাড়ার তথ্যও সহজে অনলাইনে পাওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কোন রুটে কোন ভাড়া কার্যকর, সংশ্লিষ্ট পরিবহনের পরিচিতি এবং অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি থাকলে যাত্রীদের তথ্যের ঘাটতি কমবে।
অভিযোগের ডিজিটাল রেকর্ড থাকলে কর্তৃপক্ষও বুঝতে পারবে কোনো রুট বা কোনো পরিবহনের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ আসছে। এর ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ রুটে তদারকি বাড়ানো সম্ভব। ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে মাঝে-মধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা করলেই স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি, নিয়মভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা। প্রতিটি রুটের ভাড়ার তথ্য সহজলভ্য করা, গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন, নিয়মিত মাঠপর্যায়ের তদারকি, অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার যদি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া সমন্বয়ের প্রয়োজন মনে করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি, হিসাব ও অনুমোদিত ভাড়া জনগণের সামনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আর অনুমোদিত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যেন তার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : কলাম লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক
কেকে/এআই