শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১০ আশ্বিন ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম: ● জাতিসংঘ নিখুঁত নয়, তবে অপরিহার্য: খলিলুর রহমান      ● যুদ্ধ নয়, শান্তি ও মানবতার বিশ্ব চায় বাংলাদেশ: প্রধানমন্ত্রী      ● সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকি মোকাবিলায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর      ● রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় সাবেক ওসি রাকিবুল পাঁচ দিনের রিমান্ডে       ● ‘শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরলে কিছু হবে না’ বলা সেই ওসি গ্রেপ্তার      ● ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় আটজনের মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ১৭৮২      ● হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
টাকায় কেনা আপস নয়, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:৪৯ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

রাজধানীর বারিধারায় ফুটপাতে বসে থাকা এক নির্মাণশ্রমিককে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনায় নিহতের পরিবারের সঙ্গে আসামিপক্ষের ৯ লাখ টাকায় আপস হয়েছে— এই খবর আমাদের সমাজের এক গভীর ও পীড়াদায়ক বাস্তবতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। নিহত মেহেদী হাসান মীম ছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী, কানে শুনতে পেতেন না। ফুটপাতে বসে থাকা অবস্থাতেই একটি প্রাইভেটকার তাকে চাপা দেয়, ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। আর গাড়িতে ছিল এক কিশোর, যাকে প্রথমে আটক করে ও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল; সিসিটিভি ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রমাণ ছড়িয়ে পড়ার পরই তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হয় পুলিশ। এর আগে মামলায় প্রকৃত চালকের বদলে অন্য একজনকে আসামি করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।

এই ঘটনা কেবল একটি সড়ক দুর্ঘটনা বা একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়— এটি আমাদের সমাজে বিচারের সামর্থ্য কীভাবে অর্থের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, তারই এক নির্মম দৃষ্টান্ত। আসামিপক্ষের আইনজীবী নিজেই স্বীকার করেছেন, নিহতের পরিবার প্রথমে ১০ লাখ টাকা দাবি করেছিল, পরে ৯ লাখ টাকায় রফা হয়। প্রশ্ন উঠতে বাধ্য— একজন মানুষের জীবনের মূল্য কি সত্যিই এভাবে দর-কষাকষির মাধ্যমে নির্ধারিত হতে পারে? আর এই দর-কষাকষি হয়েছে কোথায়? আদালতে নয়, বরং ঘটনায় জড়িত পরিবারের সংশ্লিষ্ট এক ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে, যেখানে সেই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই উপস্থিত ছিলেন। ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া যখন প্রভাবশালী পক্ষের অফিসকক্ষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা আর নিরপেক্ষ থাকে না।

আমাদের সমাজে বারবার দেখা গেছে, প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারের কেউ সড়ক দুর্ঘটনা বা সহিংসতায় প্রাণ হারালে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। মামলা চালানোর সামর্থ্য, আইনি লড়াইয়ের ধৈর্য কিংবা প্রভাবশালী পক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস— এসবের অভাবে বহু পরিবার শেষ পর্যন্ত আপসের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এই ঘটনাতেও নিহতের বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণের বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেছেন। কিন্তু এই যুক্তি আসলে দারিদ্র্যের সুযোগ নেওয়ারই আরেক নাম। একটি দরিদ্র পরিবারের আর্থিক অসহায়ত্বকে পুঁজি করে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার এই প্রবণতা যদি স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হতে বাধ্য।

আরও উদ্বেগের বিষয়, ফৌজদারি বিধান অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর অপরাধ আপসযোগ্য (পড়সঢ়ড়ঁহফধনষব) নয়। ব্যক্তিপর্যায়ে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়া-নেওয়া হলেও রাষ্ট্রেরপক্ষ থেকে মামলা পরিচালনা ও অপরাধের বিচার চলতে থাকার কথা। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, এ ধরনের আপসের পর আসামিপক্ষ জামিন বা খালাস পাওয়ার আশায় থাকে, আর রাষ্ট্রপক্ষের ভূমিকা কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে প্রভাবশালী ও অর্থবান পক্ষ বারবার আইনের প্রকৃত প্রয়োগ এড়িয়ে যাচ্ছে।

এই ঘটনার আরেকটি উদ্বেগজনক দিক হলো, গাড়ি চালাচ্ছিল একজন কিশোর— যার আইনসম্মত লাইসেন্স থাকার কথা নয়। অপ্রাপ্তবয়স্কদের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দেওয়া অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতারই বহিঃপ্রকাশ, যার মাশুল দিতে হলো একজন নিরীহ শ্রমজীবী মানুষকে। এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; শহরের রাস্তায় প্রায়ই দেখা যায় প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া সত্ত্বেও পারিবারিক প্রভাব ও অর্থবিত্তের জোরে কিশোরেরা গাড়ি চালাচ্ছে, আর দুর্ঘটনা ঘটলে পরিবারের সামর্থ্য দিয়েই তার দায় মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে।

আমরা মনে করি, এই প্রবণতা রুখতে হলে কেবল একটি মামলার সুরাহায় থেমে থাকলে চলবে না, কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে আমাদের কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থাকল—সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঘটনায় ব্যক্তিপর্যায়ে আর্থিক সমঝোতা হলেও রাষ্ট্রপক্ষের মামলা পরিচালনা যেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও পূর্ণ শক্তিতে চলতে থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। 
আপসনামা যেন ফৌজদারি বিচারপ্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়ার হাতিয়ার হয়ে না ওঠে, সে বিষয়ে আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলিদের সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্কদের গাড়ি চালানো রোধে পরিবার, গাড়ির মালিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি ব্যবস্থাকে দায়বদ্ধ করতে হবে। একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ঘটালে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও অভিভাবককেও ফৌজদারি দায়বদ্ধতার আওতায় আনা প্রয়োজন। 

দুর্ঘটনার প্রকৃত ঘটনাক্রম আড়াল করে ভিন্ন ব্যক্তিকে আসামি সাজানোর মতো প্রবণতা রোধে তদন্তকারী সংস্থার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং শুরু থেকেই সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ সংগ্রহে অবহেলা এড়াতে হবে। একটি মানুষের জীবনের মূল্য কখনোই টাকায় পরিমাপযোগ্য নয়। বিচারব্যবস্থার কাজ ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেওয়া নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের জীবনের মূল্য যদি রাষ্ট্র সমানভাবে রক্ষা করতে না পারে, তাহলে আইনের শাসনের দাবি ফাঁপা বুলিমাত্র থেকে যাবে। 

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close