সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬,
২ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ভূমধ্যসাগর থেকে ২৯ বাংলাদেশি উদ্ধার, নিহত ১০      চিকিৎসকদের ফাঁকি বন্ধে ডিজিটাল নজরদারি      ঢাকায় মৃদু ভূমিকম্প অনুভূত      গাজায় প্রতি রাতে ৩০-৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যার পরিকল্পনা      কৃষক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরে আলম গ্রেপ্তার      ছয় মাস পূর্তিতে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা      কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশ বিমানের উড়োজাহাজে কারিগরি ত্রুটি, আটকা ১২৭ যাত্রী      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আয়ভেদে বাংলাদেশের পুষ্টির বাস্তবতা
ড. শহীদুল ইসলাম
প্রকাশ: সোমবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন শুধু মাথাপিছু আয়, জিডিপি বা রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না; মানুষের থালায় কী ধরনের খাবার রয়েছে, সেটিও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। একই দেশের দুটি পরিবারের মাসিক আয়ের পার্থক্য যেমন তাদের জীবনযাত্রার মান বদলে দেয়, তেমনি বদলে দেয় প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা, ক্যালোরি গ্রহণ, প্রোটিনের উৎস এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য। তাই আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে এখন শুধু মানুষ কতটুকু খায়, সেটি নয়; বরং মানুষ কী খায়, কতটা উচ্চমানের প্রোটিন পায় এবং সেই খাদ্য কেনার সামর্থ্য রাখে কি না—এসব প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, দারিদ্র্যের হার কমেছে, শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্প্রসারিত হয়েছে এবং খাদ্য উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু এ উন্নয়নের সুফল সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। খাদ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলেও পুষ্টির মান এখনো আয়ের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন একটি চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলকে পুষ্টিগত সমতার মাধ্যমে প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ। খাদ্যাভ্যাস ও আয়ের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জনগণকে মোটামুটি ছয়টি অর্থনৈতিক শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এটি কোনো সরকারি শ্রেণিবিন্যাস নয়; বরং বিভিন্ন আয়, খাদ্যভোগ ও পুষ্টি বিশ্লেষণের ভিত্তিতে একটি ব্যবহারিক চিত্র। এ বিশ্লেষণ অনুযায়ী প্রায় ১৮ শতাংশ মানুষ অতি নিম্ন আয়ের, ৩২ শতাংশ নিম্ন আয়ের, ২৮ শতাংশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের, ১৪ শতাংশ মধ্যম আয়ের, ৬ শতাংশ উচ্চ-মধ্যম আয়ের এবং ২ শতাংশ উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীতে অবস্থান করেন। অর্থাৎ দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ এখনও নিম্ন ও অতি নিম্ন আয়ের মধ্যে বাস করেন এবং প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ নিম্ন, নিম্ন-মধ্যম ও মধ্যম আয়ের গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

আয়ের এ পার্থক্য সরাসরি খাদ্যাভ্যাসে প্রতিফলিত হয়। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন যে, একজন মানুষের স্বাস্থ্য শুধু মোট ক্যালোরি গ্রহণের ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই ক্যালোরির উৎস এবং খাদ্যের পুষ্টিমানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ প্রতিদিন পর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ করলেও যদি তার খাদ্যে উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে অপুষ্টি, রোগপ্রবণতা এবং কর্মক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি থেকেই যায়। এ কারণেই আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞানে এখন ‘ঐরফফবহ ঐঁহমবৎ’ বা গোপন অপুষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

অতি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক আয় সাধারণত ১৫ হাজার টাকার কম। এই শ্রেণিতে দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ৩ কোটি ২০ লাখ মানুষ বসবাস করেন। তাদের দৈনন্দিন খাদ্যের প্রধান অংশ ভাত। অনেক পরিবারে সকালের খাবার হয় আগের দিনের ভাত বা রুটি, দুপুরে ভাতের সঙ্গে সামান্য ডাল এবং রাতেও একই ধরনের খাবার। সপ্তাহে এক বা দুই দিন ছোট মাছ জোটে, আর মাংস বা দুধ অনেকের জন্য উৎসবের খাবার। এ গোষ্ঠীর মানুষের দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ সাধারণত ১,৮০০ থেকে ২,১০০ কিলোক্যালোরি, আর প্রোটিন গ্রহণ ৩৫ থেকে ৪৫ গ্রাম। এর বড় অংশই আসে চাল থেকে, ফলে উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি রয়ে যায়।

নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক আয় সাধারণত ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এরা দেশের সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী প্রায় ৩২ শতাংশ, অর্থাৎ ৫ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের খাদ্যতালিকায় ভাত, ডাল, আলু, মৌসুমি শাকসবজি এবং ছোট মাছ বা ডিম থাকে। সপ্তাহে এক বা দুই দিন মুরগির মাংস খাওয়া সম্ভব হলেও গরুর মাংস, দুধ বা ফল নিয়মিত কেনা অনেকের পক্ষে কঠিন। এদের দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ সাধারণত ২,০০০ থেকে ২,৩০০ কিলোক্যালোরি এবং প্রোটিন গ্রহণ ৪৫ থেকে ৫৫ গ্রাম। অর্থাৎ শক্তির চাহিদা মোটামুটি পূরণ হলেও উচ্চমানের প্রোটিন এখনো সীমিত।

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শ্রেণি হলো নিম্ন-মধ্যম আয়ের পরিবার। মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫ কোটি মানুষ এ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাদের মাসিক আয় সাধারণত ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। খাদ্যতালিকায় ভাতের পাশাপাশি প্রায় প্রতিদিন মাছ, সপ্তাহে কয়েক দিন ডিম, মাঝেমধ্যে মুরগির মাংস, ডাল, শাকসবজি এবং মৌসুমি ফল থাকে। দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ ২,২০০ থেকে ২,৫০০ কিলোক্যালোরি এবং প্রোটিন গ্রহণ ৫৫ থেকে ৬৫ গ্রাম। অনেক ক্ষেত্রে এটি একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ন্যূনতম চাহিদার কাছাকাছি হলেও শিশু, কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী নারী এবং শারীরিক পরিশ্রমী মানুষের জন্য এটি সবসময় যথেষ্ট নয়।

এই তিনটি শ্রেণির মানুষ মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রায় ১৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৭৮ শতাংশ। এদের খাদ্যের বড় অংশ এখনো ভাত ও অন্যান্য শস্যজাত খাদ্য থেকে আসে। ফলে ক্যালোরির ঘাটতি আগের তুলনায় কমলেও উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের ঘাটতি এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগত চ্যালেঞ্জ। সহজভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা আর শুধু ‘পর্যাপ্ত খাবার’ নয়; বরং ‘সঠিক খাবার’ নিশ্চিত করা।

এদিকে শহরাঞ্চলে দ্রুত বাড়ছে এমন একটি শ্রেণি, যাদের খাদ্যাভ্যাসে নতুন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তারা নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, বাদাম, দই, উচ্চ-প্রোটিন খাদ্য এবং বিভিন্ন ফাংশনাল ফুড গ্রহণ করছেন। এ পরিবর্তন যেমন খাদ্যশিল্পের জন্য নতুন বাজার তৈরি করছে, তেমনি দেশের মধ্যে পুষ্টিগত বৈষম্যও আরও স্পষ্ট করে তুলছে। তাহলে কীভাবে এই বৈষম্য কমানো সম্ভব? কীভাবে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যতালিকায় ব্যয় না বাড়িয়ে প্রোটিনের পরিমাণ ও মান বাড়ানো যায়? এবং বাংলাদেশের জন্য একটি কার্যকর জাতীয় প্রোটিন নীতি কেমন হতে পারে? এসব বিষয় নিয়েই আলোচনা থাকবে আগামী পর্বে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো নিম্ন, নিম্ন-মধ্যম এবং মধ্যম আয়ের গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। অর্থনৈতিক অবস্থার এ পার্থক্য শুধু জীবনযাত্রার মানেই নয়, প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা, পুষ্টির মান এবং ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যেও গভীর প্রভাব ফেলে। তাই দেশের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা করতে হলে শুধু আয় বৃদ্ধি নয়, সেই আয় মানুষের থালায় কতটা পুষ্টিকর খাবার পৌঁছে দিচ্ছে, সেটিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক আয় সাধারণত ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে। এরা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। এই শ্রেণির পরিবারগুলো সাধারণত প্রতিদিন মাছ বা ডিম, সপ্তাহে কয়েক দিন মুরগি বা গরুর মাংস, নিয়মিত দুধ, দই, ফলমূল ও শাকসবজি গ্রহণ করতে পারে। তাদের দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণ প্রায় ২,৩০০ থেকে ২,৭০০ কিলোক্যালোরি এবং প্রোটিন গ্রহণ ৬৫ থেকে ৮০ গ্রামের মধ্যে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তারা একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ন্যূনতম প্রোটিন চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হন।

উচ্চ-মধ্যম আয়ের পরিবার, যারা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ, তাদের খাদ্যতালিকা আরও বৈচিত্র্যময়। দেশীয় মাছ ও মাংসের পাশাপাশি সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত খাদ্য, বাদাম, বীজ, ফলমূল এবং উচ্চ-প্রোটিন প্রস্তুত খাদ্যও নিয়মিত থাকে। দৈনিক প্রোটিন গ্রহণ সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ গ্রামের মধ্যে। অন্যদিকে দেশের মাত্র ২ শতাংশ উচ্চ আয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাস আন্তর্জাতিক প্রবণতার সঙ্গে দ্রুত মিলছে। তাদের মধ্যে প্রোটিনসমৃদ্ধ পানীয়, গ্রিক দই, হুই প্রোটিন, স্পোর্টস নিউট্রিশন, বিশেষায়িত শিশু খাদ্য এবং বিভিন্ন খাদ্য সম্পূরকের ব্যবহার ক্রমেই বাড়ছে।

এ চিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে। বাংলাদেশে আজ খাদ্যের সংকটের চেয়ে পুষ্টির বৈষম্য বড় সমস্যা হয়ে উঠছে। একই দেশে একজন শিশু প্রতিদিন ডিম, দুধ, মাছ ও ফল খেতে পারছে, আবার আরেকজন শিশু একই দিনে শুধু ভাত, সামান্য ডাল আর আলু খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। ক্যালোরি হয়তো উভয়েরই মোটামুটি পূরণ হচ্ছে, কিন্তু শরীরের বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি একেবারেই সমান নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শিশুর জীবনের প্রথম এক হাজার দিন অর্থাৎ গর্ভধারণ থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্তÑ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে পর্যাপ্ত প্রোটিনের ঘাটতি হলে শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং ভবিষ্যতের শিক্ষাগত সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা, প্রবীণ ব্যক্তি এবং কঠোর পরিশ্রমী শ্রমিকদেরও সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি প্রোটিনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাস্তবে এই জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই চাহিদা পূরণ করতে পারেন না।

বাংলাদেশের খাদ্যনীতির ভবিষ্যৎ তাই শুধু চাল উৎপাদনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। গত কয়েক দশকে চাল উৎপাদনে যে সাফল্য এসেছে, তা অবশ্যই ধরে রাখতে হবে। তবে একইসঙ্গে ডাল, দুধ, ডিম, মাছ, সয়াবিন এবং অন্যান্য উচ্চমানের প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের উৎপাদন ও সহজলভ্যতা বাড়ানোও সমান জরুরি। কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, খাদ্যশিল্প এবং জনস্বাস্থ্যÑ এ চারটি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশের খাদ্যশিল্পের জন্যও এটি একটি বড় সুযোগ। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চ-প্রোটিন দই, বিস্কুট, রুটি, নুডলস, পানীয়, শিশু খাদ্য, সিনিয়র নিউট্রিশন, মেডিক্যাল নিউট্রিশন এবং প্ল্যান্ট-প্রোটিনভিত্তিক পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে ডালভিত্তিক স্ন্যাকস, মাছের প্রোটিন, দুধভিত্তিক পুষ্টিপণ্য, সয়াবিন প্রোটিন এবং অন্যান্য মূল্যসংযোজিত খাদ্য উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এতে একদিকে যেমন মানুষের পুষ্টি উন্নত হবে, অন্যদিকে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির সুযোগও সৃষ্টি হবে।

পুষ্টিগত বৈষম্য কমাতে কয়েকটি বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বিদ্যালয়ের খাবার কর্মসূচিতে নিয়মিত ডিম বা অন্য কোনো উচ্চমানের প্রোটিন অন্তর্ভুক্ত করা, নিম্ন আয়ের গর্ভবতী নারীদের জন্য পুষ্টি সহায়তা বৃদ্ধি, ডাল ও অন্যান্য প্রোটিনসমৃদ্ধ ফসলের উৎপাদনে প্রণোদনা দেওয়া, ক্ষুদ্র মাছের উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থা উন্নত করা এবং জনগণের মধ্যে পুষ্টি শিক্ষা বাড়ানো এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

একই সঙ্গে আমাদের একটি জাতীয় প্রোটিন নীতি নিয়ে ভাবতে হবে। এই নীতির উদ্দেশ্য হবে শুধু প্রোটিন উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত প্রোটিন নিশ্চিত করা। এর আওতায় কৃষি গবেষণা, খাদ্যপ্রযুক্তি, শিল্প বিনিয়োগ, পুষ্টি শিক্ষা, শিশু ও মাতৃপুষ্টি এবং খাদ্য উদ্ভাবনকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে ভবিষ্যতের খাদ্যব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে; বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের অংশ হতে পারে।

তবে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবারকেও খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। অনেকেই এখনো মনে করেন, ভালো পুষ্টি মানেই ব্যয়বহুল খাবার। বাস্তবে ডিম, ডাল, ছোট মাছ, ছোলা, সয়াবিন, মুগডাল, চিনাবাদাম এবং দুধ এসব খাদ্য তুলনামূলক কম খরচে উচ্চমানের পুষ্টি সরবরাহ করতে পারে। সচেতন খাদ্য নির্বাচন অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই পরিবারের পুষ্টির মান উন্নত করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের সামনে এখন শুধু খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়; বরং এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে, যেখানে একজন শিশুর পুষ্টি তার পরিবারের আয়ের ওপর নির্ভর করবে না। উন্নত জাতি গড়তে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টিগত ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।
একটি দেশের প্রকৃত সম্পদ তার খনিজ, শিল্প কিংবা অবকাঠামো নয়; তার মানুষ। আর সুস্থ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল মানুষ গড়ে ওঠে সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্যের মাধ্যমে। তাই বাংলাদেশের আগামী দিনের উন্নয়ন পরিকল্পনায় আয় বৃদ্ধি এবং পুষ্টি উন্নয়নকে একই সূত্রে দেখতে হবে। যে দিন দেশের প্রতিটি মানুষের থালায় আয়ের পার্থক্য নয়, বরং পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পুষ্টির নিশ্চয়তা থাকবে, সেদিনই বাংলাদেশের উন্নয়ন সত্যিকার অর্থে আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।

লেখক : খাদ্য বিজ্ঞানী, বার্মিংহাম, যুক্তরাজ্য

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  বাংলাদেশ   পুষ্টি   বাস্তবতা  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close