মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা      র‌্যাব বিলুপ্ত করে ‘এসআরবি’ গঠনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন      বদলাচ্ছে অর্থবছরের সময়কাল      এবার ওমানকে বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের      ২৭৭ কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি      মানবতাবিরোধী অপরাধ : ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার রায় যে কোনো দিন      তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ যুবরাজের      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস, কাঠামোগত পরিবর্তনে জোর দিন
খোলা কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১১:১৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

সরকারের ১৮০ দিন পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন যে খতিয়ান তুলে ধরেছেন, তাতে কৃষিঋণ মওকুফ থেকে শুরু করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধ, স্কুলপোশাক বিতরণ কিংবা এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসমুক্ত পরিবেশ এসব অর্জনের একটি দীর্ঘ তালিকা উঠে এসেছে। 

এই তালিকার প্রতিটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব অস্বীকারের উপায় নেই। কিন্তু ছয় মাস পূর্তির এই মুহূর্তে প্রশ্ন একটিই এই সরকার কি কেবল ত্রাণ ও স্বস্তির ব্যবস্থা করেছে, নাকি ষোলো বছরের ফ্যাসিবাদী যে কাঠামোর তার ভিত্তিমূলে আঘাত হানছে? এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি। ঋণ মওকুফ, ভাতা প্রদান বা স্কুলপোশাক বিতরণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় এগুলো যেকোনো সরকারই স্বল্প সময়ে বাস্তবায়ন করতে পারে, কারণ এসবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয় না। 

কিন্তু পুলিশ ও প্রশাসনকে বিরাজনীতিকরণ, বিচারবিভাগীয় স্বাধীনতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সুরক্ষিত করা, অর্থ পাচারের সহায়ক আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে দেওয়া, কিংবা দুর্নীতির বিরুদ্ধে এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করা যা পরবর্তী যে কোনো সরকারের আমলেও অক্ষত থাকবে এসবই আসল পরীক্ষা। উপদেষ্টা মাহদী আমিনের বক্তব্যে পুলিশ-প্রশাসনে ‘রাজনৈতিক হয়রানিমুক্ত ও সেবাধর্মী’ কাঠামো তৈরির দাবি এসেছে বটে, কিন্তু তা কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে, কী পরিমাপযোগ্য সূচকে তা যাচাই করা যাবে তা স্পষ্ট নয়। 

তৃতীয় বিশ্বের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল নয়, যেখানে নতুন সরকার প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই দৃশ্যমান কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ২০০৩ সালের রোজ রেভল্যুশনের পর জর্জিয়ায় মিখাইল সাকাশভিলির সরকার ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই ২০০৪ সালের জুলাইয়ে দেশের পুরো ট্রাফিক পুলিশ বাহিনী একদিনে বরখাস্ত করে সম্পূর্ণ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত বাহিনী গঠন করে। কেজিবি-ধাঁচের নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত করা হয়, ঘুষ-নির্ভর পুলিশি কাঠামোর বদলে একেবারে নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দাঁড় করানো হয়। এই সাহসী, দ্রুত ও অপ্রিয় সিদ্ধান্তের ফল তাৎক্ষণিক না হলেও ছিল দীর্ঘস্থায়ী এক দশকের মধ্যে জর্জিয়া বিশ্বের অন্যতম স্বচ্ছ পুলিশি ব্যবস্থার দেশে পরিণত হয়।

একইভাবে ১৯৯৮ সালে ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর তিন দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর প্রেসিডেন্ট হাবিবি ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম কয়েক মাসেই সংবাদমাধ্যমের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ প্রত্যাহার করেন, রাজনৈতিক বন্দিীদর একাংশকে মুক্তি দেন, রাজনৈতিক দল গঠনের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সরকারি হস্তক্ষেপমুক্ত স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করেন। অর্থনীতি তখনো ধ্বংসস্তূপে, তবু তিনি কাঠামোগত সিদ্ধান্তগুলো পিছিয়ে রাখেননি। এই দুই দৃষ্টান্তের মূল শিক্ষা একটাই প্রকৃত সংস্কারের জানালাটি সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে ক্ষমতার প্রথম কয়েক মাসেই, রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকে। এই সময়টুকু পার হয়ে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থগোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত হয়ে ওঠে, আর সংস্কারের রাজনৈতিক মূল্য বেড়ে যায়।

ইশতেহার অনুযায়ী বিএনপি সরকারের ৩১ দফা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু নাগরিকদের প্রশ্ন অর্থ পাচার রোধে যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কথা বলা হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কী; ব্যাংকিং খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে যে নীতি সহায়তার উল্লেখ হয়েছে, তা আইনি কাঠামোয় রূপ নেবে কবে; বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক হয়রানির অবসানের যে দাবি করা হচ্ছে, তা যাচাইযোগ্য কোনো স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হবে কি না। সদিচ্ছা ও দায়বদ্ধতার কথা বারবার উচ্চারণ করা যথেষ্ট নয়; সদিচ্ছাকে আইন, বিধি ও স্বাধীন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বেঁধে ফেলাই হলো প্রকৃত রূপান্তরের লক্ষণ। 

এই পরিস্থিতিতে সরকারের কিছু বিষয়ে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করছি। প্রথমত, ছয় মাসে যেসব প্রশাসনিক ও ত্রাণমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু তা যেন কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপিত না হয়। 

দ্বিতীয়ত, পুলিশ-প্রশাসন সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও অর্থ পাচার রোধে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হচ্ছে, তার প্রতিটির জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। 

ষোলো বছরের ধ্বংসস্তূপ থেকে ছয় মাসে পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন বাস্তবিকভাবে অসম্ভব কিন্তু এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই বলা দরকার, নাগরিকগণ এই মুহূর্তে সরকারের কাছ থেকে সমস্যার সমাধান নয়, বরং সমাধানের পথে যে কাঠামোগত অগ্রগতি হয়েছে তার স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য বিবরণ প্রত্যাশা দাবি রাখে।   

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close