বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে গত দেড় দশকে সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা। কিন্তু এর বিপরীতে একটি প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আর্থিক দায় আমরা কতদিন এবং কীভাবে বহন করব?
গ্রাহকের জন্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী রাখতে সরকার বছরের পর বছর ভর্তুকি দিয়ে আসছে। ভর্তুকি নিজে কোনো খারাপ বিষয় নয়। নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বজায় রাখা কিংবা সাময়িক সংকট মোকাবিলায় ভর্তুকি প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন ভর্তুকি সাময়িক সহায়তা থেকে স্থায়ীভাবে ব্যয় ও অদক্ষতার ঘাটতি পূরণের ব্যবস্থায় পরিণত হয়।
ভর্তুকির অর্থনৈতিক চক্র
বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে সমস্যাটি শুধু উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ক্রয়, capacity payment, বিভিন্ন চুক্তিগত দায়, জ্বালানি ব্যয়, অর্থায়ন ব্যয়, বকেয়া এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয়—সব মিলিয়ে একটি বড় আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
সরকার ভর্তুকি দেয় → সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি পূরণ হয় → কিন্তু কাঠামোগত ব্যয় কমে না → আবার ঘাটতি তৈরি হয় → বকেয়া বাড়ে → ঋণ ও সুদের বোঝা বাড়ে → পরবর্তী সময়ে সরকারের ওপর আরও বড় আর্থিক দায় আসে।
এভাবে ভর্তুকি অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান না করে সমস্যাকে ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
প্রতিষ্ঠান বাড়লেই কি দক্ষতা বাড়ে?
বিদ্যুৎ খাতকে Generation, Transmission ও Distribution-এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাগ করার পেছনে দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর যৌক্তিকতা ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—বিভিন্ন স্তরে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরির ফলে প্রকৃত অর্থে কতটা দক্ষতা বেড়েছে এবং কতটা অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি হয়েছে?
প্রশ্নটি হওয়া উচিত—কতগুলো কোম্পানি আছে তা নয়; প্রতিটি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট খরচ কত বাড়াচ্ছে এবং রাষ্ট্রের ওপর কত আর্থিক দায় তৈরি করছে।
যদি একই কাজ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং তার ফলে শুধু প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যয় বাড়ে, তাহলে সেই কাঠামো পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি।
এখন প্রয়োজন “Subsidy Reform”
সরকারের এখনই গত ১৭ বছরের বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির একটি পূর্ণাঙ্গ Subsidy Audit করা উচিত। কত টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে গেছে, কোন কারণে গেছে এবং এর বিনিময়ে কী ধরনের কার্যকর ফল পাওয়া গেছে—এসব তথ্য একটি সমন্বিত কাঠামোয় মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ভর্তুকিকে তিন ভাগে দেখা যেতে পারে—
প্রথমত, জনগণের প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা;
দ্বিতীয়ত, জাতীয় অর্থনীতি ও কৌশলগত স্বার্থে প্রয়োজনীয় সহায়তা;
তৃতীয়ত, অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে সৃষ্ট ঘাটতি।
তৃতীয় ধরনের ভর্তুকি কোনোভাবেই স্থায়ী হতে দেওয়া উচিত নয়।
প্রতিটি সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের Economic Value Test করা দরকার। কোনো প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করছে, নাকি শুধু একটি স্তর থেকে আরেক স্তরে অর্থ স্থানান্তর করছে—তা নির্ধারণ করতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান একীভূত, পুনর্গঠন কিংবা অপ্রয়োজনীয় কাঠামো বিলুপ্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে ভর্তুকির সঙ্গে Performance Condition যুক্ত করা জরুরি। যে প্রতিষ্ঠান ভর্তুকি পাবে, তাকে খরচ কমানো, বকেয়া আদায়, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থিক সংস্কারের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে।
জনগণের জন্য ভর্তুকি, অদক্ষতার জন্য নয়
ভর্তুকি যদি প্রয়োজন হয়, তা যেন সরাসরি প্রয়োজনীয় গ্রাহককে সহায়তা করে। কোনো প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা বা অতিরিক্ত ব্যয়কে বছরের পর বছর জনগণের করের অর্থ দিয়ে ঢেকে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বাংলাদেশ এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন কত বাড়ল—এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। একই সঙ্গে জানতে হবে—
এই বিদ্যুতের প্রকৃত অর্থনৈতিক মূল্য কত?
রাষ্ট্র কত টাকা দিচ্ছে?
কেন দিচ্ছে?
এবং এই ব্যয় কতদিন চলবে?
বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত “More Subsidy” নয়, “Subsidy Reform”।
অর্থাৎ প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তা থাকবে, জাতীয় স্বার্থের প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ থাকবে; কিন্তু অদক্ষতা, অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার দায় অনির্দিষ্টকাল জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না।
ভর্তুকি সমস্যার সমাধান হতে পারে—যদি তা সঠিক জায়গায় যায়। কিন্তু ভর্তুকি যদি সমস্যার কারণগুলো আড়াল করে রাখে, তাহলে আজকের ভর্তুকিই আগামী দিনের আরও বড় আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
লেখক: প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন মিলন
মেম্বার, এ্যাব
কেকে/এলএ