মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬,
৩ ভাদ্র ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬
শিরোনাম: ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশ পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা      র‌্যাব বিলুপ্ত করে ‘এসআরবি’ গঠনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন      বদলাচ্ছে অর্থবছরের সময়কাল      এবার ওমানকে বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার হুমকি ট্রাম্পের      ২৭৭ কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি      মানবতাবিরোধী অপরাধ : ওবায়দুল কাদেরসহ শীর্ষ সাত নেতার রায় যে কোনো দিন      তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ যুবরাজের      
খোলা মত ও সম্পাদকীয়
আফাল : প্রকৃতির নয়, রাষ্ট্র-নির্মিত বিপর্যয়
রাসেল আহমদ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৮ পিএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

একসময় হাওরে আফাল ছিল, কিন্তু আফালের কাছে মানুষ পরাজিত হতো না। বর্ষার আকাশ কালো হলে, উজানের পাহাড়ি ঢল নেমে এলে আর দমকা বাতাসে হাওরের বুক উত্তাল হয়ে উঠলে মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি হতো ঠিকই, কিন্তু আতঙ্ক নয়। কারণ তখন প্রকৃতি নিজেই মানুষের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ ছিল। গ্রামের চারপাশে সারি সারি হিজল, করচ, বরুণ, মেরা, চালিয়া বন আর বাঁশঝাড়ের সবুজ বেষ্টনী দাঁড়িয়ে থাকত অতন্দ্র প্রহরীর মতো। হাওরের বুক চিরে ছুটে আসা আফাল প্রথম আঘাত হানত সেই বৃক্ষরাজির বুকে। ঢেউয়ের গতি ভেঙে যেত, শক্তি ক্ষয়ে যেত, তারপর তা পৌঁছাত মানুষের বসতিতে।এই কারণেই আফাল ছিল প্রকৃতির অংশ, কিন্তু জনপদের নিয়তি ছিল না। 

হাওরের মানুষের কাছে জল কখনোই কেবল পানি ছিল না; ছিল জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং সভ্যতার ভিত্তি। সেই জলকে ধারণ করেই গড়ে উঠেছিল এক স্বতন্ত্র জলসভ্যতা। সেখানে প্রকৃতি ও মানুষ প্রতিপক্ষ ছিল না, ছিল পরস্পরের সহযাত্রী। জলজ বন ছিল মাছের প্রজননক্ষেত্র, পরিযায়ী পাখির আশ্রয়, নদীতীরের রক্ষাকবচ, ভূমিক্ষয় প্রতিরোধক এবং একই সঙ্গে বসতির নিরাপত্তা বলয়। প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান অন্যটির সঙ্গে যুক্ত ছিল এক গভীর ভারসাম্যে। এই ভারসাম্যই ছিল হাওরের প্রকৃত সম্পদ। কিন্তু রাষ্ট্র যখন হাওরকে একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র হিসেবে নয়, কেবল অর্থনৈতিক সম্পদের আধার হিসেবে দেখতে শুরু করল, তখন সেই ভারসাম্য ভাঙার সূচনা হলো। 

উন্নয়নের প্রচলিত ধারণায় নদী হয়ে উঠল বালুর উৎস, বিল হয়ে উঠল রাজস্বের খাতা, জলমহাল হয়ে উঠল ইজারার সম্পদ, আর জলজ বন পরিণত হলো কেটে ফেলার কাঠে। যে প্রকৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল, তাকে ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক মুনাফার হিসাবের বাইরে ঠেলে দেওয়া হলো। জলজ বনাঞ্চল কখনো একদিনে উধাও হয়নি। হিজল, করচ, বরুণ কিংবা মেরা গাছ একসঙ্গে হারিয়ে যায়নি। প্রথমে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর নামে কাটা হয়েছে। পরে জ্বালানির প্রয়োজন মেটাতে কাটা হয়েছে। কৃষিজমি সম্প্রসারণের যুক্তিতে উপড়ে ফেলা হয়েছে। কোথাও প্রশাসনের নীরবতা, কোথাও নীতির দুর্বলতা, কোথাও মুনাফার লোভ সব মিলিয়ে কয়েক দশকের মধ্যেই হাওরের প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা বলয় ভেঙে পড়েছে। ফলে পরিবর্তন এসেছে শুধু প্রকৃতিতে নয়, আফালের চরিত্রেও।

যে ঢেউ একসময় বৃক্ষরাজির বুকে শক্তি হারিয়ে ফেলত, আজ সেই ঢেউ উন্মুক্ত জলরাশি পেরিয়ে সরাসরি আঘাত হানে মানুষের বসতিতে। যে গ্রাম একসময় প্রকৃতির নিরাপত্তায় শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে ছিল, সেই গ্রাম আজ প্রতি বর্ষায় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই লড়ে। অর্থাৎ আফাল বদলায়নি; বদলে গেছে হাওরের প্রতিরোধক্ষমতা। এই পরিবর্তনকে যদি আমরা কেবল জলবায়ু পরিবর্তন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখি, তাহলে সমস্যার মূল কারণ আড়াল হয়ে যাবে। কারণ প্রকৃতির শক্তি সবসময়ই ছিল। কিন্তু সেই শক্তিকে ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার যে প্রাকৃতিক অবকাঠামো ছিল, তা মানুষের হাতেই ধ্বংস হয়েছে। এই জায়গাতেই আফাল একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থ ধারণ করে। 

আজকের আফাল কেবল উজানের ঢল নয়; এটি হারিয়ে যাওয়া হিজলবনের আর্তনাদ, নিশ্চিহ্ন করচবাগের নীরব প্রতিবাদ এবং পরিবেশকে কেবল রাজস্বের উৎস হিসেবে দেখার রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির নির্মম প্রতিফলন। প্রকৃতি কোনো প্রতিশোধ নেয় না; প্রকৃতি কেবল তার হারানো ভারসাম্যের মূল্য আদায় করে। হাওরের মানুষ আজ সেই মূল্য দিচ্ছে। তবে এই গল্পের এখানেই শেষ নয়। জলজ বন ধ্বংস ছিল কেবল শুরু। এর পরের অধ্যায়ে হাওরের নদী, জলমহাল এবং বালু-পাথরের ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো এমন এক ইজারাভিত্তিক অর্থনীতি, যা শুধু প্রকৃতিকেই নয়, শতাব্দীপ্রাচীন শ্রমজীবী সমাজকেও ভেঙে দিল। নদী থেকে সরে গেল মানুষ, নদীতে নেমে এল যন্ত্র; জীবিকার জায়গা দখল করল মুনাফা; আর প্রকৃতির জায়গা দখল করল ক্রমবর্ধমান পুঁজির আগ্রাসন। সেখান থেকেই আফাল আর শুধু একটি প্রাকৃতিক ঢেউ রইল না; ধীরে ধীরে তা রাষ্ট্র-নির্মিত এক বিপর্যয়ের প্রতীকে পরিণত হলো। 

জলজ বনাঞ্চল উজাড়ের ইতিহাস হাওরের বিপর্যয়ের কেবল একটি অধ্যায়। এর সমান্তরালে আরও একটি নীরব পরিবর্তন ঘটেছে, যার অভিঘাত আজও হাওরের প্রতিটি নদী, বিল এবং জনপদ বহন করছে। সেটি হলো- হাওরের সম্পদের ওপর মানুষের ঐতিহ্যগত অধিকার থেকে পুঁজিনির্ভর নিয়ন্ত্রণে উত্তরণের ইতিহাস। হাওর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডারগুলোর একটি। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলো প্রতি বর্ষায় পাহাড় থেকে বয়ে আনে বালু ও পাথর। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সম্পদ ছিল স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার স্বাভাবিক ভিত্তি। 

মাছ ধরার জেলে, বারকির শ্রমিক, বালু-পাথর উত্তোলনকারী দিনমজুর কিংবা নদীকেন্দ্রিক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী- সকলেই প্রকৃতির সঙ্গে এক ধরনের অলিখিত সামাজিক চুক্তির অধীনে বেঁচে ছিলেন। তারা প্রকৃতি থেকে নিতেন, কিন্তু প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়; কারণ তারা জানতেন, নদী বেঁচে থাকলেই তাদের জীবনও বেঁচে থাকবে। এই সম্পর্ক ভেঙে যায়, যখন রাষ্ট্র নদী, বিল ও জলমহালকে নাগরিকের জীবিকার উৎসের আগে রাজস্বের উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। স্বাধীনতার বহু দশক পরও হাওরে টিকে থাকে সামন্তীয় ইজারাপদ্ধতির কাঠামো। নাম বদলেছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বদলেছে, কিন্তু দর্শন বদলায়নি। 

জলমহাল, বালুমহাল কিংবা পাথরমহাল- সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে রাজস্ব আদায়। রাষ্ট্রের কাছে নদী হয়ে উঠেছে আয়; কিন্তু নদীর সঙ্গে শতাব্দীজুড়ে গড়ে ওঠা শ্রম, সংস্কৃতি ও সমাজের সম্পর্ক নীতিনির্ধারণে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে গেছে। এই ইজারাভিত্তিক কাঠামোর একটি স্বাভাবিক পরিণতি হলো দ্রুততম সময়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের প্রতিযোগিতা। আর এখানেই প্রকৃতি সবচেয়ে বড় পরাজিত। মাছের উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের নামে জলের নিচে কৃত্রিম আবাস তৈরির জন্য কাটা হয়েছে হিজল, করচ, বরুণসহ অসংখ্য জলজ বৃক্ষ। নগরসভ্যতার উপকরণ ও স্থানীয় জনপদের  জ্বালানির চাহিদা মেটাতে নির্বিচারে উজাড় হয়েছে জলজ বনাঞ্চল। 

কৃষিজমি সম্প্রসারণের যুক্তিতে উপড়ে ফেলা হয়েছে শত শত বছরের বৃক্ষরাজি। যে গাছগুলো প্রকৃতির ভাষায় জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করত, সেগুলো অর্থনীতির ভাষায় পরিণত হয়েছে কেবল ব্যবহারযোগ্য সম্পদে। একই দর্শন নদীতেও প্রয়োগ হয়েছে। যে নদী একসময় হাজারো শ্রমজীবী মানুষের ঘামে বালু-পাথর তুলে জীবিকা দিত, সেখানে আজ শ্রমিকের জায়গা দখল করেছে ড্রেজার, সিভ মেশিন এবং ভারী যান্ত্রিক প্রযুক্তি। নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, তলদেশের গঠন কিংবা তীরের স্থায়িত্ব- কোনোটিই আর মুনাফার হিসাবের কেন্দ্র নয়। 

সীমাহীন উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ গভীর হয়েছে, কোথাও অস্বাভাবিকভাবে প্রশস্ত হয়েছে, কোথাও ভেঙে পড়েছে তীরের ভারসাম্য। অনেক স্থানে নদীতীর কেটে সম্পদ উত্তোলনের ফলে বিলীন হয়েছে তীররক্ষাকারী বৃক্ষরাজিও।এখানেই আফালের সঙ্গে নদী হত্যার সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।আফালের শক্তি প্রকৃতি তৈরি করে, কিন্তু সেই শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে নদীর স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতি এবং জলজ বনাঞ্চল। যখন এই দুই প্রতিরক্ষা স্তরই ধ্বংস করা হয়, তখন একই ঢেউ বহুগুণ বেশি বিধ্বংসী হয়ে ওঠে। অর্থাৎ আজকের আফালের পেছনে যেমন জলবায়ুর প্রভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের পরিকল্পিত পরিবেশবিনাশও। এই বাস্তবতাকে কেবল পরিবেশগত সংকট বললে পুরো সত্য বলা হবে না। এটি একই সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকট। কারণ এই ব্যবস্থায় লাভের অংশীদার অল্প কয়েকজন, কিন্তু ক্ষতির ভার বহন করে পুরো হাওর। 

রাজস্বের হিসাব রাষ্ট্রের খাতায় জমা হয়, মুনাফা যায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে, আর নদীভাঙন, বাস্তুচ্যুতি ও জীবিকাহীনতার মূল্য দেয় সেই মানুষ, যাদের পূর্বপুরুষেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হাওরের সম্পদ সংরক্ষণ করেই জীবন কাটিয়েছেন। অর্থনীতির ভাষায় এটিকে উন্নয়ন বলা যেতে পারে; কিন্তু পরিবেশের ভাষায় এটি আত্মবিনাশ, আর সামাজিক ন্যায়ের ভাষায় এটি অধিকারচ্যুতি। এই কারণেই হাওরের সংকটকে কেবল নদীভাঙন, আফাল কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংকট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত রাষ্ট্র, সম্পদ এবং ক্ষমতার সম্পর্কের সংকট। যেখানে প্রকৃতির জায়গা দখল করেছে রাজস্ব, শ্রমের জায়গা দখল করেছে যন্ত্র, আর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জায়গা দখল করেছে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। আর যখন কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন-দর্শন প্রকৃতির ভারসাম্যের বদলে কেবল রাজস্বের হিসাবকে অগ্রাধিকার দেয়, তখন ইতিহাসের নিয়মেই একসময় সেই উন্নয়নের মূল্য প্রকৃতি সুদে-আসলে ফিরিয়ে দেয়। হাওরের মানুষ আজ সেই মূল্যই পরিশোধ করছে।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায়টি লেখা হচ্ছে আজকের হাওরে। সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরপাড়ের বাহাদুরপুর গ্রামে দাঁড়ালে সেই ইতিহাসকে বই পড়ে জানতে হয় না; চোখের সামনেই দেখা যায়। একসময় যে গ্রামে সারিবদ্ধ বসতভিটা ছিল, আজ সেখানে ভাঙনের দাগ। চলতি বর্ষায় অন্তত ২০ থেকে ২৫টি ঘরবাড়ি ইতোমধ্যে হাওরের পানিতে বিলীন হয়েছে। আরও বহু পরিবার প্রতিটি রাত কাটাচ্ছে অনিশ্চয়তায়। ঢেউয়ের শব্দ এখন তাদের কাছে প্রকৃতির সঙ্গীত নয়; মৃত্যুঘণ্টা। দিন-রাত বাঁশ, বালুভর্তি বস্তা আর কচুরিপানা ফেলে মানুষ ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, তারা আসলে লড়ছে কয়েক দশকের নীতিগত ব্যর্থতার বিরুদ্ধে। কারণ যে জলজ বন একসময় ঢেউয়ের শক্তি শুষে নিত, তা আর নেই। যে নদী স্বাভাবিক প্রবাহে ভারসাম্য রক্ষা করত, তার ভূপ্রকৃতিও আর আগের মতো নেই। ফলে একটি রাতই যথেষ্ট হয়ে উঠছে একটি পরিবারের সারাজীবনের সঞ্চয় মুছে দিতে। 

বাহাদুরপুরের বাসিন্দা হিমানি রানী বর্মণের কণ্ঠে তাই শুধু ব্যক্তিগত বেদনা নেই; আছে একটি জনপদের ইতিহাস। ‘স্থায়ী সমাধান চাই। সরকারের কাছে আর কিছু চাই না। বাচ্চাকাচ্চা নিয়া বাঁচতে চাই। কত কষ্ট কইরা ঘর বানাই। আফালের ঢেউ আইয়া সব ভাইঙা নিয়া যায়। বাঁশ দিয়া, বস্তা দিয়া কত চেষ্টা করি, তবু আটকাইতাম পারি না।’

এই আর্তি কেবল একটি ঘর রক্ষার আবেদন নয়; এটি রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের সবচেয়ে মৌলিক অধিকার- নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার- নিশ্চিত করার আবেদন। বাহাদুরপুরের মানুষ একা নয়। হাওরের অসংখ্য গ্রাম আজ একই বাস্তবতার মুখোমুখি। কেউ ভিটেমাটি হারিয়ে সিলেটে, কেউ ঢাকায়, কেউ অন্য কোথাও গিয়ে নতুন জীবন শুরু করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বাস্তুচ্যুতি কখনো উন্নয়ন নয়। একটি জনপদ হারানো মানে শুধু কয়েকটি ঘর হারানো নয়; হারিয়ে যায় স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক, লোকজ জ্ঞান এবং একটি জলসভ্যতার ধারাবাহিকতা। এ অবস্থায় কেবল ত্রাণ, টিন কিংবা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ এগুলো ক্ষতির পরের প্রতিক্রিয়া; অথচ প্রয়োজন ক্ষতির আগের প্রতিরোধ। প্রথমত, হাওরের জলজ বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারকে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। 

দ্বিতীয়ত, নদী ও হাওরের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি ধ্বংস করে এমন অবৈধ ও অপরিকল্পিত ড্রেজিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তৃতীয়ত, জলমহাল ও বালু-পাথর মহালের ইজারা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত অধিকার, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং জনস্বার্থকে রাজস্বের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলোতে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত ওয়েভ প্রটেকশন ব্যবস্থা, তীর সংরক্ষণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।  

এই লেখার আগে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি টিন বরাদ্দ রয়েছে; আবেদন সাপেক্ষে যাচাই-বাছাই শেষে তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি আফাল ও নদীভাঙন থেকে বসতভিটা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে। এই প্রতিশ্রুতি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি এখনও প্রতিক্রিয়াশীল রাষ্ট্র হয়েই থাকব, নাকি প্রতিরোধমূলক রাষ্ট্রে পরিণত হব? প্রতি বর্ষায় ভাঙনের ছবি দেখে সহায়তা পাঠানো সহজ; কিন্তু এমন নীতি গ্রহণ করা কঠিন, যাতে ভবিষ্যতে সেই ভাঙনই না ঘটে। অথচ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই। আজ তাই রাষ্ট্রের কাছে প্রশ্ন কেবল বাহাদুরপুরের নয়, সমগ্র হাওরাঞ্চলের। যে হাওর শতাব্দীর পর শতাব্দী এই দেশের খাদ্য, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে, সেই হাওর কি কেবল রাজস্ব আহরণের খনি? যে মানুষ নদী, বিল ও জলাভূমি রক্ষা করে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই জলসভ্যতাকে টিকিয়ে রেখেছে, তারা কি কেবল দুর্যোগের পর ত্রাণ পাওয়ার জন্যই রাষ্ট্রের নাগরিক?

লেখক :  ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও কলামিস্ট
(মতামত লেখকের নিজস্ব)

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলা মত ও সম্পাদকীয়- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close