দেশের পার্বত্য ও পাহাড় অধ্যুষিত জেলাগুলোতে বর্ষা এলেই একটি আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে পাহাড়ধস। বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও হবিগঞ্জের মাধবপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো আবারও প্রমাণ করছে, এ ঝুঁকি প্রতিবছরের একই পুরোনো গল্প টানা ভারী বর্ষণ, নদী ও ছড়ার পানি বৃদ্ধি, ফাটল ধরা পাহাড়, মাইকিং করে সতর্কতা প্রচার, আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণহানি ঠেকানোর মরিয়া চেষ্টা।
রাঙামাটিতে ইতোমধ্যে ১ জন এবং কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে, বান্দরবানের সাত উপজেলায় কয়েক হাজার পরিবার এখন ঝুঁকিতে; হবিগঞ্জের মাধবপুরে কৃষিজমি, মাছের খামার ও সড়ক ব্যাপক ক্ষতির মুখে। প্রশ্ন হলো, প্রতিবছর একই দুর্যোগ ফিরে আসার পরও আমরা কেন শুধু প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাপনাতেই আটকে থাকি, প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপে নয়?
বান্দরবানের মৃত্তিকা ও পানি সংরক্ষণ কেন্দ্রের একজন বিশেষজ্ঞ যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত পাহাড় কাটার কারণে ওপরের মাটির স্তর সরে গিয়ে ভেতরের নরম অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে, যার ফলে ফাটল সৃষ্টি হয় এবং ভারী বর্ষণে সে ফাটলে পানি প্রবেশ করলে ধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ পাহাড়ধস নিছক প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত পাহাড় কাটা, বনভূমি ধ্বংস এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপনের প্রবণতা।
রাঙামাটিতে প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশে বাস করছে, বান্দরবানেও কয়েক হাজার পরিবার একই অবস্থায়। এসব বসতি রাতারাতি গড়ে ওঠেনি বছরের পর বছর প্রশাসনের নাকের ডগায় এই ঝুঁকিপূর্ণ বসতি বিস্তার লাভ করেছে। এখানে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ভূমি ব্যবস্থাপনা, পাহাড় কাটা বন্ধ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন বসতি স্থাপন প্রতিরোধ করা স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে।
এটা স্বীকার করতেই হবে, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোয় প্রশাসনের তাৎক্ষণিক তৎপরতা লক্ষণীয়। বান্দরবানে ২২০টি এবং রাঙামাটিতে ৪১টি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং করে সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে, পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং থানচিতে আটকে পড়া পর্যটক-গাইডদের নিরাপদে উদ্ধারও করা হয়েছে। এ প্রস্তুতি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক এবং সম্ভাব্য প্রাণহানি ঠেকাতে সহায়ক। কিন্তু ২০১৭ সালের ১৩ জুন রাঙামাটিতে পাহাড়ধসে ১২০ জনের মৃত্যুর মতো ভয়াবহ ঘটনার পরও যদি একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ বসতি অব্যাহত থাকে, তাহলে বুঝতে হবে দুর্যোগপরবর্তী শিক্ষা কাঠামোগত পরিবর্তনে রূপ নেয়নি।
সাময়িক সতর্কতা ও উদ্ধার তৎপরতা প্রয়োজনীয় হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিকল্প হতে পারে না। পাহাড় কাটা বন্ধে বিদ্যমান আইনের কঠোর ও নিয়মিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দুর্যোগের মৌসুমে তৎপর হয়ে লাভ নেই; সারা বছরই পাহাড় কাটা রোধে নজরদারি প্রয়োজন। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে, যেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে নিরাপদ আবাসনের ব্যবস্থা থাকবে।
শুধু বর্ষা মৌসুমে আশ্রয়কেন্দ্রে সাময়িক স্থানান্তর যথেষ্ট নয়। নদী ও খাল খনন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বসতবাড়ি ও কৃষিজমি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা প্রয়োজন, যাতে প্রতিবছর একই ক্ষতির পুনরাবৃত্তি এড়ানো যায়। নয়তো প্রতি বর্ষায় আমরা একই সংবাদ, একই আতঙ্ক আর একই ক্ষতির পুনরাবৃত্তি দেখতেই থাকব।
কেকে/ এমএস