বাংলাদেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নগরায়ণ বাড়ছে, একের পর এক বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে, সেতু, সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, গ্যাস ও জ্বালানি অবকাঠামোসহ বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে অবকাঠামোগত উন্নয়নও এখন জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই উন্নয়নের নেপথ্যে যে পেশাটি মানুষের জীবন, সম্পদ ও জননিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত-সেই প্রকৌশল পেশার নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির কাঠামো কি আমাদের দেশে যথেষ্ট সুসংগঠিত? এই প্রশ্নটি এখন আর শুধু প্রকৌশলীদের পেশাগত স্বার্থের প্রশ্ন নয়। এটি জননিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্ন।
একজন প্রকৌশলীর একটি ভুল নকশা, ভুল হিসাব, নিম্নমানের তদারকি কিংবা পেশাগত অবহেলার পরিণতি কখনো কখনো একটি মানুষের জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি ভবনের কাঠামোগত বিপর্যয়, একটি সেতুর ত্রুটি, একটি শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ব্যর্থতা কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নকশাগত ভুলের সঙ্গে শত শত মানুষের জীবন ও জাতীয় সম্পদের প্রশ্ন জড়িয়ে থাকতে পারে। তাই প্রকৌশল পেশাকে কেবল একটি শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পেশাগত সদস্যপদের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।
প্রশ্ন হচ্ছে- বাংলাদেশে একজন প্রকৌশলী কে, তিনি কোন পর্যায়ে পেশাগতভাবে প্রকৌশলচর্চা করতে পারবেন, তাঁর পেশাগত সক্ষমতা কীভাবে যাচাই হবে, পেশাগত অসদাচরণ হলে কে ব্যবস্থা নেবে এবং সাধারণ মানুষ কীভাবে নিশ্চিত হবে যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল কাজ একজন যথাযথভাবে নিবন্ধিত ও জবাবদিহিমূলক পেশাজীবীর মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে? আমাদের দেশে বাংলাদেশ প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে প্রকৌশলীদের পেশাগত উন্নয়ন, সদস্যপদ, পেশাগত স্বীকৃতি ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। একইভাবে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও খাতভিত্তিক আইন ও বিধিমালার মাধ্যমে প্রকৌশল কার্যক্রমের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে।
পেশাগত সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় আইনপ্রতিষ্ঠিত নিয়ন্ত্রক সংস্থা কি একই বিষয়? একটি পেশাগত প্রতিষ্ঠান একটি পেশার উন্নয়ন, সদস্যদের প্রতিনিধিত্ব, জ্ঞানচর্চা ও পেশাগত মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু জনস্বার্থে কোনো পেশার সর্বজনীন অনুমোদন, নিবন্ধন, শৃঙ্খলাগত নিয়ন্ত্রণ এবং সংরক্ষিত পেশাগত চর্চা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি প্রয়োজন কি না-সেটি নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গভীর আলোচনা হওয়া জরুরি।
বিশ্বের বহু দেশে প্রকৌশল পেশাকে জননিরাপত্তার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি নিয়ন্ত্রিত পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পেশাগত সক্ষমতা, নিবন্ধন, অনুমোদন, অব্যাহত পেশাগত উন্নয়ন, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলাগত ব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও কি এমন একটি কাঠামোর প্রয়োজন নেই?
আমার বিশ্বাস, সময় এসেছে বিষয়টি নতুন করে ভাবার। আমি কোনো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খর্ব করার কথা বলছি না। বরং বাংলাদেশ প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠানসহ দেশের বিদ্যমান পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি আধুনিক, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ প্রকৌশল পরিষদ গঠনের বিষয়ে জাতীয় আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন। এমন একটি পরিষদের অধীনে থাকতে পারে-জাতীয় পর্যায়ের প্রকৌশলী নিবন্ধন তালিকা; প্রকৌশলীদের সক্ষমতাভিত্তিক নিবন্ধন ও অনুমোদন; বিভিন্ন প্রকৌশল শাখার পেশাগত মানদণ্ড; অব্যাহত পেশাগত উন্নয়ন; পেশাগত নৈতিকতা ও আচরণবিধি; পেশাগত অসদাচরণের তদন্ত ও শৃঙ্খলাগত ব্যবস্থা; প্রকৌশলীদের সংরক্ষিত পেশাগত পদবি ও পেশাচর্চার কাঠামো; প্রকৌশল শিক্ষা ও স্বীকৃতির সঙ্গে সমন্বয়; গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি প্রকৌশল কাজে যোগ্য পেশাজীবী নিশ্চিত করার ব্যবস্থা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই ব্যবস্থা যেন কোনো একটি সংগঠনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য না হয়; বরং জনস্বার্থ, পেশাগত মান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য হয়। এখানে সাংবিধানিক প্রশ্নও রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা, আইনের আশ্রয় এবং পেশা বা জীবিকা পরিচালনার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষকে আইনের সীমার মধ্যে থেকে কাজ করতে হয়।
অতএব, যখন কোনো পেশার কার্যক্রম সরাসরি মানুষের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন রাষ্ট্রের সেই পেশার মান, জবাবদিহি ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অযৌক্তিক নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত-রাষ্ট্র কীভাবে প্রকৌশল পেশার সর্বোচ্চ পেশাগত মান এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে কেন্দ্র করে নয়; উত্তরটি হতে হবে একটি শক্তিশালী, নিরপেক্ষ ও আইনভিত্তিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এ ধরনের একটি পরিষদ গঠন মানেই বাংলাদেশ প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠান বা অন্যান্য বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের বিলুপ্তি নয়। বরং দায়িত্বের সুস্পষ্ট বিভাজন করা যেতে পারে। পেশাগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ প্রকৌশলীদের প্রতিষ্ঠান তার ঐতিহাসিক ও পেশাগত ভূমিকা পালন করতে পারে।
অন্যদিকে একটি আইনপ্রতিষ্ঠিত প্রকৌশল পরিষদ রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে নিবন্ধন, অনুমোদন, শৃঙ্খলা এবং জনসুরক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারে। এতে বরং দ্বৈততা কমবে, দায়িত্ব স্পষ্ট হবে এবং প্রকৌশল পেশায় জবাবদিহি বাড়বে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৌশল কোনো সাধারণ পেশা নয়।
একটি ভবনের কাঠামোগত স্থিতিশীলতা থেকে শুরু করে একটি সেতুর নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা, শিল্পকারখানার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, পরিবহন অবকাঠামো-প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সঙ্গে প্রকৌশল পেশা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে- যে পেশার সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে, সেই পেশার জন্য একটি আধুনিক জাতীয় নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকবে না কেন? আমার এই প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পেশাজীবী সংগঠনের বিরুদ্ধে নয়। বরং এটি একটি নীতিগত প্রশ্ন। এটি একটি জাতীয় প্রশ্ন।
সর্বোপরি, এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের প্রশ্ন। আজ আমরা যদি একটি সুসংগঠিত প্রকৌশল নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলে আগামী দিনে প্রকৌশল পেশায় সক্ষমতা, জবাবদিহি এবং পেশাগত সততা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষও জানতে পারবেন-কোন প্রকৌশলী কোন পর্যায়ে পেশাগতভাবে নিবন্ধিত, তাঁর দায়িত্ব কী এবং পেশাগত অনিয়ম হলে কোথায় অভিযোগ করা যাবে। এ জন্য প্রয়োজন হতে পারে একটি ব্যাপক জাতীয় সংলাপ। প্রকৌশলী, স্থপতি, আইনজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, সরকারি সংস্থা, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিক সমাজ- সব পক্ষকে নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও পর্যালোচনা করা যেতে পারে। তারপর প্রয়োজন হলে সংসদে একটি আধুনিক বাংলাদেশ প্রকৌশল পরিষদ আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ একটি দেশের উন্নয়ন শুধু কতগুলো ভবন, সেতু বা সড়ক নির্মিত হলো তার ওপর নির্ভর করে না। সেগুলো কতটা নিরাপদ, কতটা টেকসই এবং কতটা জবাবদিহিমূলকভাবে নির্মিত হলো-সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে আমাদের প্রকৌশল পেশাকেও আধুনিক, স্বচ্ছ ও আইনভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে প্রশ্নটি জোরালোভাবে তোলার বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, আধুনিক ও জনস্বার্থকেন্দ্রিক আইনপ্রতিষ্ঠিত প্রকৌশল পরিষদ কি সময়ের দাবি নয়? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এই উত্তর আমাদের দিতে হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, জননিরাপত্তা এবং আইনের শাসনের স্বার্থে।
কেকে/এমএ