পাহাড়ধসে মানুষ মরার ঘটনা এটি শুধু আমাদের বাংলাদেশের জন্য নতুন ঘটনা নয়, প্রতিবছরই বৃষ্টির সময় এলে পাহাড়ধসে মানুষ মারা যায়। কিন্তু তার কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। মানুষ যখন পাহাড়ের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার চালায়, তখনই পাহাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে। প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর মানুষের তৈরি অরক্ষিত বাস্তবতার নিষ্ঠুর মেলবন্ধনে আরও একবার রক্তাক্ত হলো কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির। গভীর মাটিচাপা পড়ে প্রাণ হারালেন নারী ও শিশুসহ অন্তত আটজন।
বালুখালী, কুতুপালং, জামতলী আর জামশিয়ার চার-চারটি স্থানে ঘটে যাওয়া এ পৃথক বিপর্যয়। আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিল, উখিয়া-টেকনাফের এই আশ্রয়শিবিরগুলো এখন শুধু সাময়িক মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং এক একটি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের লঘুচাপ আর সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে হওয়া অতিভারী বৃষ্টি এ ট্র্যাজেডির তাৎক্ষণিক কারণ হতে পারে, কিন্তু এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় ও মানবিক সংকটকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এ সংকট কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এক দীর্ঘস্থায়ী এবং বহুলাংশে পূর্বাভাসযোগ্য বিপর্যয়। ২০১৭ সালে যখন মিয়ানমার থেকে লাখ লাখ রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে, তখন মানবিক কারণে বাংলাদেশ সরকার উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় আট হাজার একর বনভূমি উজাড় করে ৩৪টি আশ্রয়শিবির গড়ে তোলার অনুমতি দেয়। বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম এ মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তৎকালীন সময়ে তাৎক্ষণিক আশ্রয় নিশ্চিত করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প হয়তো ছিল না।
পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে প্রায় সাড়ে ১৪ লাখ রোহিঙ্গার বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ চরম ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হয়, মাইকিং করা হয়, কিন্তু মূল সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয় না। পাহাড়ের পাদদেশে বা ঢালুতে বসবাসকারী এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে কোথায় সরিয়ে নেওয়া হবে?
আশ্রয়শিবিরের সীমিত জায়গায় নতুন করে নিরাপদ আবাসন তৈরি করা অত্যন্ত দুরুহ। ভাসানচরে একটি অংশকে স্থানান্তরিত করা হলেও তা বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় সমুদ্রের এক ফোঁটা পানির মতো। এ সংকটের সমাধান শুধু সাময়িক উদ্ধার তৎপরতা কিংবা নিহতদের প্রতি শোক প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ফায়ার সার্ভিস, এপিবিএন এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে গভীর রাতে কাদামাটি সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে।
প্রথমত, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই এবং আবহাওয়া দপ্তরের ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ ঢালুগুলোতে বসবাসরত পরিবারগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে বা অস্থায়ী শিবিরে সরিয়ে নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ বা আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক সহায়তায় ক্যাম্পগুলোর ভেতরে পাহাড়ের মাটি ধরে রাখার জন্য পরিবেশবান্ধব প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল নির্মাণ, টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি বা ভূ-প্রাকৃতিক সংস্কারের কথা ভাবা প্রয়োজন। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে নতুন করে ঘর তৈরি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা জরুরি।
তবে সবচেয়ে বড় সত্যটি হলো, রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ মানবিক কারণে এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে যে উদারতা দেখিয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। কিন্তু এ বিশাল জনসংখ্যার বোঝা এবং তার ফলে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় এককভাবে বাংলাদেশের পক্ষে অনির্দিষ্টকালের জন্য বয়ে বেড়ানো অসম্ভব।
কক্সবাজারের প্রাকৃতিক ভারসাম্য আজ ধ্বংসের মুখে, স্থানীয় অধিবাসীরাও এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু বার্ষিক মানবিক সাহায্য বা ত্রাণের তহবিল জোগানোর গণ্ডি থেকে বেরিয়ে এসে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর ভূ-রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্থায়ীভাবে তাদের নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করতে পারে।
প্রকৃতির এ প্রতিশোধ এবং মানুষের অসহায়ত্বের অবসান ঘটাতে হলে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত, সুদূরপ্রসারী এবং আন্তরিক উদ্যোগ।
লেখক : সাংবাদিক
কেকে/ এমএস