সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭ জন      একদিনের সফরে বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী      রাজধানীতে জলাবদ্ধতা      ডোমারে সড়ক দুর্ঘটনায় মা ও দুই সন্তানসহ নিহত চার      মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি নির্দেশনা      প্রাথমিক বৃত্তির ফল প্রকাশ, সারা দেশে বৃত্তি পেল ৭৯২৪৬ জন      
খোলাকাগজ স্পেশাল
ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ
আলতাফ হোসেন
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:৩২ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক, সব পানির নিচে। কোথাও হাঁটুপানি আবার কোথাও কোমর সমান। এ যেন চিরচেনা রাজধানী ঢাকা নয়, কোনো এক অপরিচিত উপকূল। এমনই অবস্থা তৈনি হয়েছিল ঢাকা শহরের। গতকাল রোববার ভোর থেকে মুষলধারে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় ঢাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি। সৃষ্টি হয় তীব্র জলাবদ্ধতা। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসের এ বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় চরম ভোগান্তিতে পড়েন নগরবাসী।

বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট, গণপরিবহনের সংকট এবং কর্মব্যস্ত নগরজীবনে স্থবিরতা। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অথচ জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক যুগে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় এবং একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত নগর পরিকল্পনার অভাব, খাল দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণেই প্রতিবছর বর্ষা এলেই রাজধানী একই সংকটে পড়ে। তাদের মতে, খণ্ডিত উদ্যোগ নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই ঢাকাকে বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতা ও নাগরিক দুর্ভোগ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করা সম্ভব। 

প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই দৃশ্য। এবারও বর্ষার শুরুতেই একই চিত্র দেখা গেল। এতে রাজধানীতে বসবাসকারী নাগরিকদের মনে প্রশ্ন উঠেছে, প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ড্রেনেজ উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনের যে প্রকল্প নেওয়া হয়, তার সুফল কোথায়? গতকাল রোববার রাজধানীর মতিঝিল, শান্তিনগর, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা, বাড্ডা, মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ফার্মগেট, আগারগাঁও, যাত্রাবাড়ী, শনিরআখড়া, ডেমরা, উত্তরা ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় সড়কে পানি জমে আছে। অনেক অলিগলিতে হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল বিঘ্ন ঘটে। কোথাও কোথাও বাসাবাড়ি ও দোকানেও পানি ঢুকে পড়ে। সকালে অফিসগামীদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। বাসের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, অতিরিক্ত ভাড়া এবং রাইডশেয়ার সংকটে ভোগান্তি বেড়ে যায়। বৃষ্টির কারণে রাজধানীর প্রায় সব প্রধান সড়কেই যানবাহনের গতি কমে যায়। কোথাও কোথাও কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। 

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, শনিবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয় অবিরাম বর্ষণ। রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা এ মৌসুমের সর্বোচ্চ। চলতি জুলাইয়ের শুরু থেকেই দেশজুড়ে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়েছে। গত ৫ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ভারী বর্ষণ দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনো অব্যাহত রয়েছে। মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী ৪৮ ঘণ্টা দেশজুড়ে কম-বেশি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এর মধ্যে আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, রংপুর, রাজশাহী ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে বলে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

অফিসগামী মানুষের দুর্ভোগ : বৃষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ। সকাল থেকে বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতা ও তীব্র যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেননি অনেকেই। কোথাও বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে, আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। রাইড শেয়ার সেবার সংকট ও অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগও করেছেন অনেক যাত্রী। 

মতিঝিলগামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আরিফ হোসেন বলেন, ‘বাসা থেকে অফিসে পৌঁছাতে সাধারণত ৪০ মিনিট লাগে। কিন্তু আজ বৃষ্টি ও যানজটের কারণে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লেগেছে। প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ হয়, কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেখি না।’

উত্তরা থেকে কারওয়ান বাজারে কর্মস্থলে আসা সাদিয়া রহমান বলেন, একদিকে হাঁটুপানি, অন্যদিকে বাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর বাস পেলেও যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। অফিসে দেরি হওয়ায় অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।’

মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এবং একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘বৃষ্টির দিন মানেই অফিসে পৌঁছানোর অনিশ্চয়তা। কোথাও পানি, কোথাও যানজট। অনেক সময় গাড়ি থেকে নেমে হেঁটেই যেতে হয়। এত উন্নয়ন হলেও সামান্য বৃষ্টিতে রাজধানী অচল হয়ে পড়ে, এটা দুঃখজনক।’

স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ : টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে রাজধানীর স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগও ছিল চোখে পড়ার মতো। সকাল থেকেই বিভিন্ন সড়কে পানি জমে যাওয়া, যানজট এবং গণপরিবহনের সংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারেনি। আবার অনেক অভিভাবক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সন্তানদের স্কুলেই পাঠাননি। বিশেষ করে নিচু এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোকে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। 
রাজধানীর রামপুরার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার বলেন, ‘সকালে ছেলেকে স্কুলে নেওয়ার জন্য বের হয়েছিলাম। কিন্তু রাস্তায় হাঁটুপানি আর তীব্র যানজট দেখে মাঝপথ থেকেই ফিরে আসতে হয়েছে। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এভাবে চলাচল করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।’

মিরপুরের অভিভাবক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘বৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় সন্তানদের নিয়েই। স্কুলে পাঠালে নিরাপদে পৌঁছাবে কি না, আবার ফেরার সময় কীভাবে আসবে, সেই চিন্তায় থাকি। তাই অনেক সময় বাধ্য হয়ে ছুটি করিয়ে বাসায় রাখি।’

ধানমন্ডির আরেক অভিভাবক শারমিন সুলতানা বলেন, ‘শুধু বৃষ্টি নয়, জলাবদ্ধতা আর যানজটই বড় সমস্যা। স্কুলে যেতে আধা ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে দুই ঘণ্টা লেগে যায়।’

নিউমার্কেট সাময়িক বন্ধ ঘোষণা : টানা ভারী বৃষ্টিতে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতার কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে নিউমার্কেটের সব দোকানপাট। নিরাপত্তার স্বার্থে মার্কেটের বিদ্যুৎ সংযোগও সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়। নিউমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির অফিস সেক্রেটারি ফিরোজ উল ইসলাম জানান, শনিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে নিউমার্কেট এলাকায় ব্যাপক জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। ফলে সকাল থেকে কোনো দোকান খোলা হয়নি। পুরো মার্কেটের ব্যবসা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে এবং ক্রেতাদের উপস্থিতিও নেই বললেই চলে।

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) নিউমার্কেটের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রেখেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে সোমবার দোকানপাট খোলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জলাবদ্ধতা, বিদ্যুৎহীন ২ হল : টানা ভারী বর্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ছাত্রী হলের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা হয়। এতে কয়েক হাজার আবাসিক শিক্ষার্থী চরম দুর্ভোগে পড়ে।

জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ থেকে ভিসি চত্বর, গণিত ভবন, কার্জন হল ও পলাশী এলাকায়ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষক ক্লাব, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, নীলক্ষেত এলাকা, পলাশীর মোড়, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, কুয়েত-মৈত্রী ও শহীদুল্লাহ হলসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধ অবস্থা দেখা গেছে।

ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয় বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের। ক্লাস বাতিল করা হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা, বাংলা, উদ্ভিদবিজ্ঞানসহ কয়েকটি বিভাগের।

বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) তাসনিম আক্তার আলিফ নাবিলা সংবাদমাধ্যমকে জানান, সকাল থেকে হলে বিদ্যুৎ নেই। আবার যদি দু-তিন ঘণ্টা বৃষ্টি হয়, তাহলে নিচতলার রুমগুলোতে পানি উঠে যেতে পারে।
জলাবদ্ধতায় ঢাকা মেডিকেলে রোগী কমেছে ২০ শতাংশ : ঢাকা শহরে টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা ও সড়কের বেহাল অবস্থার প্রভাব পড়েছে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায়ও। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অন্যান্য দিনের তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে।

বৃষ্টির কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়ক ও অলিগলিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় শুধু রোগীরাই নন, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও কর্মস্থলে পৌঁছাতে ভোগান্তিতে পড়েছেন। এদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগ এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনের সড়কেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। সারা শহরে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। তারপরও তারা কষ্ট স্বীকার করে রোগীদের সেবা দিতে হাসপাতালে এসেছেন। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মোস্তাক আহমেদ রোববার বিকেলে বলেন, বৃষ্টির কারণে অন্যান্য দিনের তুলনায় জরুরি বিভাগে প্রায় ২০ শতাংশ রোগী কম এসেছে।

তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ২৪ ঘণ্টায় জরুরি বিভাগে দেড় হাজারের বেশি রোগী আসেন। তাদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হাসপাতালে ভর্তি হন। এসব রোগীর অধিকাংশই বিকেল থেকে রাতের মধ্যে আসেন। সকালে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। তবে অন্যান্য দিনের তুলনায় আজ সকাল ও দুপুরে রোগীর উপস্থিতি আরও কম ছিল।

ডা. মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘শুধু রোগী নয়, হাসপাতালের কর্মীদেরও দায়িত্ব পালনের জন্য কর্মস্থলে আসতে অনেক কষ্ট ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, বৃষ্টির কারণে সারা শহরে তীব্র যানজট তৈরি হয়েছে। ফলে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মীদের হাসপাতালে পৌঁছাতে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। তারপরও তারা কষ্ট স্বীকার করে রোগীদের সেবা দিতে হাসপাতালে এসেছেন।

জলাবদ্ধতা নিরসন, রক্ষণাবেক্ষণ ও নতুন অবকাঠামো নির্মাণে বিপুল সরকারি ব্যয় : সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে গত এক যুগে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কাক্সিক্ষত সুফল মিলছে না। ২০২০ সালে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনই অন্তত ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) প্রায় ৩৬০ কোটি এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রায় ৩৭০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। তবে বিপুল এ ব্যয়ের পরও বর্ষা মৌসুমে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা নিয়মিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নিয়মিত ড্রেন ও খাল পরিষ্কার, পলি ও বর্জ্য অপসারণ এবং রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনায় ডিএসসিসি প্রতিবছর প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করে।

পাশাপাশি নিউমার্কেট, গাউছিয়া ও ধানমন্ডি এলাকার দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে ৩৫০ কোটি টাকার একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ধানমন্ডি এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য বিডিআর এলাকার পাশ দিয়ে আদি বুড়িগঙ্গা পর্যন্ত নতুন আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল দখল, ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি শুধু নাগরিক ভোগান্তিই বাড়ায় না, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফুটপাতের দোকান, কুরিয়ার সেবা, পণ্য পরিবহন এবং নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হয়। কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় উৎপাদনশীলতাও কমে যায়। এছাড়া জলাবদ্ধতার কারণে ময়লা পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। 

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থা বর্তমান জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার ভরাট, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ এবং সমন্বয়হীন উন্নয়ন কার্যক্রম জলাবদ্ধতাকে আরও তীব্র করছে। তাদের মতে, শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে জলাবদ্ধতা ও বৃষ্টিজনিত দুর্ভোগ কমাতে তাৎক্ষণিক কিছু উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। তাদের মতে, সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। প্রথমত, রাজধানীর প্রাকৃতিক খাল, জলাধার, নিচু এলাকা ও পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ দখলমুক্ত করে পুনরুদ্ধার করতে হবে। এসব জলাধার বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধারণ ও দ্রুত নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয়ত, ড্রেন, নালা ও কালভার্ট নিয়মিত পরিষ্কার এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। নাগরিকদেরও এ ক্ষেত্রে সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

এ ছাড়া, জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া বিভিন্ন ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, কার্যকারিতা ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি, নিম্নমানের কাজ কিংবা অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে সরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাবে না। একইসঙ্গে আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণ, রিটেনশন পন্ড, আন্ডারগ্রাউন্ড স্টর্মওয়াটার স্টোরেজ এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্টর্ম ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এতে একদিকে জলাবদ্ধতা কমবে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও হ্রাস পাবে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, রাজধানীর উন্নয়ন কার্যক্রমে জড়িত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। এক সংস্থার উন্নয়নকাজ যেন অন্য সংস্থার কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে জন্য একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ছে, তাই ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামো নির্মাণে এ বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়ে জলবায়ু-সহনশীল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সবুজ অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে। তাদের মতে, বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নয়, বরং বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমেই রাজধানীকে বৃষ্টিজনিত দুর্ভোগ থেকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করা সম্ভব।

নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবীব বলেন, কেবল ড্রেন পরিষ্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাজধানীর প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল রক্ষা, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে প্রতি বর্ষায় রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

‎‎তিনি আরও বলেন, এসব বিষয়গুলো আমরা গত কয়েক বছর ধরে সরকারকে বলে আসছি। নগর সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন এবং অন্যান্য সংস্থাকে বলছি। এরপরও কেউ শক্তভাবে তেমন কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিশেষ করে রাজধানীতে যেসব খাল দখল করা হয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে নগরীতে জলাবদ্ধতা দূর হবে।

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  বন্যা   ঢাকা   ভুগল মানুষ  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

খোলাকাগজ স্পেশাল- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close