সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      ব্যাংককের বারে ভয়াবহ আগুন, নিহত অন্তত ২৭ জন      একদিনের সফরে বরিশালের পথে প্রধানমন্ত্রী      রাজধানীতে জলাবদ্ধতা      
খোলাকাগজ স্পেশাল
দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল
শিপার মাহমুদ
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৯:৪৮ এএম
ছবি : খোলা কাগজ

ছবি : খোলা কাগজ

দীর্ঘ হচ্ছে হাম ও উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে নতুন করে আরও ৬৯৬ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে।

গতকাল রোববার (১২ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৭৫৮ জনের মৃত্যু হলো।

সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৯০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ৮৭৯ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ১৩ হাজার ৫০০ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৪ হাজার ৩৪০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ৯০ হাজার ৬০৫ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।

এদিকে তথ্য বলছে, হামের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দক্ষিণ এশিয়ায় একসময় সফল দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল বাংলাদেশ। 

নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর জাতীয় পর্যায়ে গণটিকাদান কর্মসূচি চালিয়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হামের নির্মূল কৌশলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় ২০২০-২১ সালেও জাতীয় পর্যায়ে হামের টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করেছিল।

এসব কর্মসূচি ও নিয়মিত টিকাদানের ফলে দেশে দীর্ঘ সময় ধরে টিকাদানের উচ্চ কভারেজ বজায় ছিল এবং জনসংখ্যার বড় অংশে হার্ড ইমিউনিটি গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৯ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়।

এরপর ২০২৬ সালে দেশব্যাপী নতুন এমআর কর্মসূচিতে কভারেজ বেড়ে প্রায় ৮১ শতাংশে পৌঁছালেও প্রায় ৩৯ লাখ শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে। অর্থাৎ টানা দুই বছরই ৯৫ শতাংশের প্রয়োজনীয় টিকাদান কভারেজ অর্জন করতে পারেনি বাংলাদেশ। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুই বছরের ঘাটতি শুধু চলতি বছরের সংক্রমণ নয়, আগামী কয়েক বছরও দেশে হামের ঝুঁকি বহাল রাখতে পারে।

হাম পৃথিবীর সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে হয়। এই অবস্থাকেই বলা হয় হার্ড ইমিউনিটি। তখন কোনো এলাকায় অল্প সংখ্যক টিকা না পেলেও সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে না।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, হার্ড ইমিউনিটি একদিনে তৈরি হয় না, আবার একদিনে ভেঙেও পড়ে না। কিন্তু টানা দুই বছর প্রয়োজনীয় কভারেজ না হলে ধীরে ধীরে ইমিউনিটি গ্যাপ তৈরি হয়। এর ফল হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হামের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘এক বছরে ঘাটতি হলে পরের বছর তা পূরণ করার সুযোগ থাকে। কিন্তু পরপর দুই বছর যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিশু টিকা না পায়, তাহলে অরক্ষিত শিশুর সংখ্যা জমতে থাকে। এটাই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা না পাওয়া শিশুর সঙ্গে পরের বছর নতুন জন্ম নেওয়া শিশুরাও যুক্ত হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে একটি বড় অরক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরি হয়ে যায়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে যে বড় প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেটিও মূলত এই ইমিউনিটি গ্যাপের ফল বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করেছে।

সরকারি তথ্য অনুসারে, প্রাদুর্ভাবের পর গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম এবং এ রোগের উপসর্গ নিয়ে ৭৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়কালে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৫২২ জন। এ ছাড়া প্রায় ১৩ হাজার জনের হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এবারের জাতীয় এমআর (হাম–রুবেলা) টিকাদান কর্মসূচিতে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১ কোটি ৮৪ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু একই বয়সী শিশুদের জন্য ২৮ জুন পরিচালিত ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে অংশ নেয় ২ কোটি ২৩ লাখের বেশি শিশু। অর্থাৎ প্রায় ৩৯ লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’ পেলেও এমআর টিকার আওতায় আসেনি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও এই বড় ব্যবধানের কথা স্বীকার করেছেন। তাদের ভাষ্য, অতীতেও ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন ও টিকাদান কর্মসূচির কভারেজে কিছু পার্থক্য ছিল, তবে এবার ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। কেন এত শিশু বাদ পড়ল, তা নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে।

জনস্বাস্থ্যবিদ তাজুল ইসলাম এ বারী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এবার প্রায় ৮১ শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছে। কিন্তু হামের মতো রোগের ক্ষেত্রে এটি যথেষ্ট নয়। একই সময়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে যত শিশুর কাছে পৌঁছানো গেছে, এমআর টিকায় ততজনকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি। এর অর্থ কর্মসূচির পরিকল্পনা, প্রচার ও বাস্তবায়নে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল।’

তাজুল ইসলামের ভাষায়, ‘এই ভলিউমের শিশু বাদ পড়া খুবই মারাত্মক। কারণ, তারা শুধু নিজেরাই ঝুঁকিতে নেই, অন্যদেরও ঝুঁকিতে ফেলবে।’

কেকে/এলএ



আরও সংবাদ   বিষয়:  হাম   মৃত্যুর মিছিল  
মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close