সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
বাংলা English
ই-পেপার

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
শিরোনাম: আদ-দ্বীন হাসপাতালের বিষয়ে পরিদর্শনের পর সিদ্ধান্ত : স্বাস্থ্যমন্ত্রী      ৪১৬ বছরপূর্তিতে বর্ণিল ‘ঢাকা উৎসব’, উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রী      ১৫ জুলাই সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃক্ষরোপণের নির্দেশ      সারা দেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী      আগামী ৫ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে: প্রধানমন্ত্রী      দীর্ঘ হচ্ছে হামে মৃত্যুর মিছিল      ডুবল ঢাকা ভুগল মানুষ      
দেশজুড়ে
২৬ বছরেও বদলায়নি কটিয়াদী পৌরসভার চিত্র, উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত বাসিন্দারা
সাব্বির হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৪:৪৪ পিএম
ছবি: প্রতিনিধি

ছবি: প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভা কাগজে-কলমে দ্বিতীয় শ্রেণির পৌরসভা হলেও বাস্তবে নাগরিক সেবার চিত্র যেন ঠিক তার উল্টো। বেহাল সড়ক, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, অপ্রতুল সড়কবাতি, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ এবং নাগরিক হয়রানির অভিযোগে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে পৌরবাসীর। বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও কার্যকর সমাধান না হওয়ায় পৌরসভাকে এখন ‘দুর্ভোগের আরেক নাম’ বলেই আখ্যা দিচ্ছেন স্থানীয়রা।

সরেজমিনে পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পৌর সদর, চড়িয়াকোনা, কামারকোনা, বীরনোয়াকান্দী, ভোগপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। সামান্য বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। অনেক জায়গায় বাড়িঘর, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও খেলার মাঠ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা অকার্যকর হওয়ায় দিনের পর দিন ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

পৌর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হেলিপ্যাড সড়ক থেকে বীরনোয়াকান্দী মহল্লার সংযোগ সড়কটি এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। স্বাধীনতার পর থেকে আজও এটি কাঁচা রয়ে গেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকেও সেখানে একটি ইট পর্যন্ত বসানো হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবার নির্বাচনের আগে জনপ্রতিনিধিরা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও ভোট শেষ হলেই সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়ন হয় না।

একই চিত্র দেখা গেছে, ১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোগপাড়া মহল্লার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচা সড়কে। এছাড়া ৩ ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডসহ পৌরসভার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই রয়েছে ভাঙাচোরা রাস্তা, অপর্যাপ্ত ড্রেন, খানাখন্দ ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। কোথাও কোথাও এমন অবস্থা যে, এটি ইউনিয়ন নাকি পৌরসভা—তা বোঝাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, খোদ পৌরভবনের পেছনের সড়কও সামান্য বৃষ্টিতেই পানির নিচে তলিয়ে যায়। পৌরসভার নিজস্ব কার্যালয়ের আশপাশের এই চিত্রই নাগরিক সেবার বাস্তব অবস্থার প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

জানা যায়, ২০০১ সালে কটিয়াদী পৌরসভার যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার প্রায় ২৬ বছর পার হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন বাসিন্দারা। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নিম্নমানের উন্নয়নকাজ, দুর্বল তদারকি এবং অকার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।

বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা যেন পৌরবাসীর নিত্যসঙ্গী। সড়কে পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় সড়কবাতির অভাবে সন্ধ্যার পর নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। এতে চুরি-ছিনতাইসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কাও করছেন স্থানীয়রা।

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করায় অধিকাংশ ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে রয়েছে। মাঝে মধ্যে ড্রেন পরিষ্কার করা হলেও সেই ময়লা ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়। পরে বৃষ্টির পানিতে সেগুলো আবার ড্রেনে পড়ে গিয়ে পানি চলাচল পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নতুন নির্মিত কিছু সড়কের পাশও ইতোমধ্যে ভেঙে যাচ্ছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও যথাযথ তদারকির অভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নয়নকাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোথায় কী প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে, কত টাকা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে কিংবা কীভাবে সেই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে—এসব তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে উন্মুক্ত করা হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে পৌরসভা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২৪ কোটি ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৬৫ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে। আগের অর্থবছরে বাজেট ছিল ২১ কোটি ৩৩ লাখ ৫৪ হাজার ২৭৭ টাকা। বাজেটের পরিমাণ বাড়লেও তার সুফল মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

পৌর এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা আব্দুর রাশিদ বলেন, ‘আমাদের এলাকার রাস্তা এখনো কাঁচা। ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত একটি ইটও পড়েনি। কর দিই, কিন্তু নাগরিক অধিকার পাই না। বৃষ্টি হলে মসজিদে গিয়ে নামাজও পড়তে পারি না। অসুস্থ মানুষকে নিয়ে চলাচল করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ভোট এলেই শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।’

সমাজকর্মী মতিউর রহমান মতি বলেন, ‘২৬ বছরেও পৌরসভার দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। দায়সারা কাজ করা হচ্ছে। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় জবাবদিহিতা কমে গেছে। বাজেটের টাকা কোথায় ব্যয় হয়, মানুষ জানে না। দরিদ্ররা প্রাপ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। স্বচ্ছ অডিট, নিয়মিত তদারকি এবং সব তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইব্রাহিম বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই বাড়িতে পানি উঠে যায়। আমার ছেলেমেয়েরা কয়েকবার গর্তে পড়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। পৌরসভার লোকজন আসব, আসছি বলে আর আসে না। এমন দুর্যোগেও তাদের কোনো তৎপরতা দেখা যায় না। পৌরসভা এখন আমাদের জন্য অভিশাপে পরিণত হয়েছে।’

অভিযোগ রয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে পৌরসভায় গেলেও নাগরিকদের নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়। প্রয়োজনীয় সেবা পেতে ঘুরতে হয় দিনের পর দিন। দুর্যোগকালেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনেক সময় মাঠে দেখা যায় না বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

এ বিষয়ে কটিয়াদী পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কারার দিদারুল মতিন বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সমস্যা সমাধানে আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। লোকবল সংকট রয়েছে। প্রয়োজন হলে প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে আরও জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাঠকর্মীরা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছেন। পৌরবাসীকে সর্বোচ্চ নাগরিক সেবা দিতে আমরা আন্তরিক।’

তবে কোন কোন এলাকায় বর্তমানে কাজ চলছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার বিস্তারিত বলতে পারবেন। সমস্যা অনেক রয়েছে। ধাপে ধাপে সেগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে পৌর কর্মীদের মাঠে থাকা উচিত।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কটিয়াদী পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক লাবনী আক্তার তারানার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এদিকে পৌরবাসীর দাবি, বাজেটের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার, উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, টেকসই সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করা না গেলে কটিয়াদী পৌরসভার নাগরিক দুর্ভোগ আরও বাড়বে। তাই দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

কেকে/ এমএস


মতামত লিখুন:
Loading...
Loading...

দেশজুড়ে- এর আরো খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহসান হাবীব
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : বসতি হরাইজন, ১৭-বি, বাড়ি-২১ সড়ক-১৭, বনানী, ঢাকা-১২১৩
ফোন : বার্তা-০২২২২২৭৬০৩৭, মফস্বল-০২২২২২৭৬০৩৬, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন-০২২২২২৭৬০২৯, ০১৭৮৭৬৯৭৮২৩, ০১৮৫৩৩২৮৫১০ (বিকাশ)
ই-মেইল: [email protected], [email protected]

© 2025 Kholakagoj
🔝
close