ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২৫ বদলে ২০২৬ হয়েছে। তবুও এই ৩৬৫ দিনে কোনো সুরাহা হয়নি একজন জলজ্যান্ত মানুষের হত্যার তদন্তের। বলছি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর কথা। ঠিক এক বছর আগে (১৭ জুলাই) যার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ আজিজুর রহমান হল-সংলগ্ন পুকুর থেকে। তাৎক্ষণিকভাবে পানিতে ডুবে দুর্ঘটনাবশত মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও পরে ফরেনসিক ও ভিসেরা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়, পানিতে ডুবে নয়, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে তাকে।
তবে পুরো এক বছরে তদন্তে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিচার তো দূরের কথা, খুনিদের পরিচয়ও নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা।
এ হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীরা দ্রুত বিচারের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করেন। ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও স্মরণসভায় উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনও আন্দোলনে অংশ নেয়। সবার দাবি ছিল একটাই—হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করে দোষীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা।
এদিকে ক্যাম্পাস অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে গড়ে ওঠা আন্দোলন নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয় সাজিদের বিভাগ আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগকে। তবে দায়িত্বপ্রাপ্তির পর আন্দোলন চললেও কয়েক দিন পর তা গতি হারায়।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে সাজিদের জন্যও আন্দোলন করেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও একপর্যায়ে সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যার বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের গতি হারিয়ে যায়। পরে ১০ মাস পেরিয়ে গেলেও মামলায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় পরিবারের আবেদনের পর তদন্ত কর্মকর্তাও পরিবর্তন করা হয়।
এ ছাড়া, গত ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মনজুরুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে সাজিদ হত্যা মামলার তদন্তকাজে প্রয়োজনবোধে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, শিক্ষার্থী বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেওয়া হয় সিআইডিকে। তারা বিভিন্ন সময়ে সাজিদের বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকসহ অন্যান্যদের জিজ্ঞাসাবাদ করলেও এখনো কোনো ক্লু পাননি। তবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপের মুখে কিছুদিন পরপর ইবির প্রক্টর অফিসে সিআইডির ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হলেও প্রায় একই ধরনের আশাবাদ একাধিকবার ব্যক্ত করায় তা শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে সেই আপডেট ব্রিফিংও।
তবে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছিল। তাতে দেখা যায়, সাজিদ হত্যার পরে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাজিদের ব্যবহৃত শহীদ জিয়াউর রহমান হলের ১০৯ নম্বর কক্ষের বেডটি তদন্তের স্বার্থে এলোমেলো করে ওই অবস্থায় কক্ষটি সিলগালা করে রাখা হলেও দ্বিতীয় দফায় ২৩ জুলাই সংশ্লিষ্টরা গিয়ে সাজিদের কক্ষটি পরিপাটি অবস্থায় দেখতে পান।
প্রশাসনের অগোচরে কক্ষে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে সন্দেহ হলে ওই কক্ষের সিলগালাকৃত তালার চাবির খোঁজ করা হয়। এ সময় জানা যায়, লাশ উদ্ধারের পর সাজিদ আব্দুল্লাহর ব্যবহৃত কক্ষটি তাৎক্ষণিকভাবে তালাবদ্ধ করে সিলগালা করার জন্য যে তালাটি লাগানো হয়েছিল, সেটি হল মসজিদের। ওই তালার তিনটি চাবির মধ্যে একটি হলের একজন কর্মচারীর কাছে, একটি হল মসজিদের ইমামের কাছে এবং অপরটি সাদ্দাম হোসেন হলে অবস্থানরত একজন শিক্ষার্থীর কাছে ছিল বলে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ঘটনার পর সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল হত্যাকাণ্ডের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ। এক বছর পরও সেদিনের বিকেল ৫টা থেকে রাত ১১টার কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ফুটেজ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোথাও বলা হয়েছে ফুটেজ নেই, কোথাও প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা বলা হয়েছে, আবার কোথাও আংশিক তথ্য পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এমনকি তৎকালীন প্রশাসন সিসিটিভি প্রসঙ্গে আইসিটি সেলকে ব্যাখ্যা দিতে বললেও শেষ পর্যন্ত সেই সিসিটিভি রহস্যেরও কোনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।
সাজিদ হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম পুষ্প বলেন, “গত বছর আজকের এই দিনে আমাদের বন্ধু সাজিদ আব্দুল্লাহকে নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়। বিগত প্রশাসনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের গাফিলতি ও তালবাহানার অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিরই পরিণতিতে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় আরও একটি হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমান উপাচার্য মহোদয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের কেউ নন। তার কাছে আমাদের প্রত্যাশা, তিনি শিক্ষার্থীদের নিজের সন্তানের মতো বিবেচনা করে সাজিদ আব্দুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেবেন এবং ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।”
এ বিষয়ে সাজিদের বাবা আহসান হাবিবুল্লাহ দেলওয়ার বলেন, “এক বছর হতে চলল, আমার ছেলের বিচার এখনো হলো না। তাহলে কি বিচার হবে না? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন—কেউ কিছুই এখনো জানাতে পারে না। আমি নিজেই মাঝে মাঝে ফোন দিই, কিন্তু তারা কোনো খোঁজ নেয় না। মাঝে মাঝে শুধু ছাত্রসংগঠনের কেউ কেউ খোঁজ নেয়। আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল, সেটাও দেওয়া হয়নি।”
তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে বর্তমানে মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিআইডি ইন্সপেক্টর মহব্বত হোসেন বলেন, “আমি এই মামলার দায়িত্ব পেয়েছি এক মাস আগে। মামলার তদন্ত চলমান। তদন্ত চলাকালীন অবস্থায় কোনো তথ্য জানানো সম্ভব নয়। তবে আমরা সাক্ষ্য নিচ্ছি, জিজ্ঞাসাবাদ করছি, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বিশ্লেষণ করছি। কত দিন সময় লাগতে পারে, সেটিও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে কোনো ধরনের ক্লু পেলে আমরা দ্রুত সমাধান করতে পারব।”
কেকে/এলএ