শিক্ষামন্ত্রীর একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যকে পরিকল্পিতভাবে বিকৃত ও ভুলভাবে উপস্থাপন করে দেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে একটি বা একাধিক স্বার্থান্বেষী মহল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বক্তব্যের খণ্ডিত ও সম্পাদিত অংশ ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একাংশকে উসকে দেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। অথচ শিক্ষামন্ত্রী শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়ে কথা বলে এসেছেন। তিনি কোনো ভুল না করেও সংসদে ভুল স্বীকার করেছেন। সম্প্রতি ঢাকা সিটি কলেজের এক নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর সাড়ে তিন মিনিটের একটি ফোনকলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। অথচ নামধারী কিছু শিক্ষার্থী, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও কিছু চক্র ভুলভাবে ছড়ানো বক্তব্যের সুযোগ নিয়ে উসকানি দিয়ে যাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের আন্দোলনের নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান এই কর্মসূচির নেপথ্যে রয়েছে পরীক্ষা বর্জন ও নকলপ্রবণ একটি চক্র, যাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থী পরিচয়ে নাশকতার পরিকল্পনা করা একদল অছাত্র ও বহিরাগত। তাদের অশ্লীল আচরণের একাধিক ভিডিও-ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সাধারণ মানুষেরা বলেছে, কোনো ভদ্র ঘরের সন্তান বা কোনো শিক্ষার্থী এ ধরনের আচরণ করতে পারেন না।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সূত্র ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আন্দোলনে অংশ নেওয়া তথাকথিত পরীক্ষার্থীদের বড় অংশই মূলত নিয়মিত পড়াশোনা করা শিক্ষার্থী নয়। পরীক্ষার হলে কড়াকড়ি ও নকল করার সুযোগ না পেয়ে তারা পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। এই ক্ষোভকে পুঁজি করে এবং শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা এখন মন্ত্রীর পদত্যাগের অযৌক্তিক দাবি তুলছে। মূল ধারার মেধাবী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, তখন এই বিশেষ চক্রটি সড়ক অবরোধ করে শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করছে। আবার তাদের রসদ জোগাচ্ছে পতিত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা। সামাজিকমাধ্যমে বিভিন্ন পোস্টে গুজব ছড়িয়ে উসকানি দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে, গত কয়েক দিন ধরে চলা এই হঠকারী আন্দোলনের কারণে রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান নগরীগুলোতে তীব্র জনভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বন্ধ রাখায় স্থবির হয়ে পড়ে জনজীবন। অফিসগামী সাধারণ মানুষ, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা মুমূর্ষু রোগী এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। দাবির নামে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এই সংস্কৃতিতে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী অভিভাবক ও সাধারণ নাগরিকেরা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনানুষ্ঠানিক সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, শিক্ষার্থীদের এই ভিড়ের মধ্যে বিপুল সংখ্যক অছাত্র ও বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। শিক্ষার্থী সেজে তারা বিভিন্ন পয়েন্টে নাশকতা ও ভাঙচুরের পরিকল্পনা করছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া এমন অনেকের আচরণ ও রাজনৈতিক স্লোগান তাদের ছাত্র পরিচয়কে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সামনে রেখে কোনো একটি মহল জল ঘোলা করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে।
অথচ শিক্ষামন্ত্রী যে বৈঠক করেন, সেখানে শিক্ষার্থীদের পক্ষ নিয়েই কথা বলেন। সম্প্রতি ঢাকা সিটি কলেজের এক নারী শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর সাড়ে তিন মিনিটের একটি ফোনকলেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। মন্ত্রী সেই শিক্ষার্থীকে অভিভাবকের মতো করে পড়ালেখায় ঠিকভাবে মনোযোগ দেওয়ারও পরামর্শ দেন।
ঐ ফোনকলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রচুর বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে আমি সেই বৈঠকে দ্বিমত পোষণ করি। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সামনে আর বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। ফলে পরীক্ষা নিতে অসুবিধা নেই। আর শিক্ষার্থীদের কথিত ফার্মের মুরগি বলারও সেই ব্যাখ্যা দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে উদ্দেশ্য করে কথাটি বলি। কারণ, একদিন বৃষ্টিতে ভিজলেই সে তিন দিন অসুস্থ থাকে। অথচ আমার খণ্ডিত বক্তব্যকে ছড়িয়ে দিয়ে আন্দোলন মাঠে নামানো হলো।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যারা সম্মুখসারিতে রয়েছে, তাদের অনেকের পরিচয় সামনে আসছে। অনেকের সঙ্গে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সংযোগ পাওয়া গেছে। কয়েকজন আবার শিবিরের সঙ্গে যুক্ত বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অনেকে আবার পরীক্ষার্থীই নয়। কেউ নবম শ্রেণি-দশম শ্রেণিতেও পড়ে। অনেকে আবার যে স্কুলে পড়ালেখা করে বলে দাবি করেছে, পরে জানা গেছে তারা সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীই নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের তীব্র বিষোদগার ও সমালোচনা দেখা গেছে। নেটিজেনরা বলছেন, পড়াশোনা না করে পরীক্ষার শর্টকাট খোঁজা এবং রাস্তাঘাট বন্ধ করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা কোনো প্রকৃত শিক্ষার্থীর কাজ হতে পারে না। ফেসবুক ও অন্যান্য মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, যৌক্তিক কোনো আলোচনা ছাড়া এভাবে জনজীবন বিপর্যস্ত করার পেছনে নিশ্চিতভাবেই কোনো তৃতীয় পক্ষের উসকানি রয়েছে।
এদিকে নামধারী শিক্ষার্থীদের এমন সব দাবিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সমস্যাগুলোর সমাধান করা হলেও শিক্ষার মান ক্ষুণ্ন হয়- এমন কোনো সিদ্ধান্ত সরকার নেবে না। পরীক্ষা বাতিল, বিনা পরীক্ষায় পাস কিংবা অটোপাসের দাবিতে কোনো আন্দোলন মেনে নেওয়া হবে না। গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারলে তাকে পরবর্তী সময়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। প্রশ্নপত্রে ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের নম্বর পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পরও আন্দোলনের নামে রাস্তা বন্ধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি কিংবা পরীক্ষা ছাড়াই পাসের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেকোনো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানানোর আগে ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট যাচাই করা জরুরি। নকল করতে না পারার ক্ষোভ থেকে সৃষ্ট এই বিশৃঙ্খলাকে কঠোর হস্তে দমন করে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
তারা আরও বলছেন, এমন আন্দোলনের ক্ষেত্রে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অভিভাবককে সতর্ক হতে হবে। তাদেরকে বুঝতে হবে, কেন বা কী কারণে আন্দোলন হচ্ছে। আন্দোলন কারা করছে। এর পেছনে কারা কারা আছে। কোনো রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার জন্য কোনো চক্র কাজ করছে কিনা- এসব বুঝতে হবে। অযথা বা না বুঝেই মাঠে নামা কোনো সমাধান নয়। বরং অনেক সময় এ ধরনের আন্দোলনে দেশের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এই আন্দোলনেও যারা পড়ুয়া-পরিশ্রমী শিক্ষার্থী, তাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। দেশের সঙ্গে এই ক্ষতির মাশুল শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবককেও দিতে হবে। ফলে প্রতিটি ঘটনার ভেতরে ঢুকে জানা-বোঝা উচিত।
কেকে/এলএ