কওমি ধারার সাতটি ইসলামি রাজনৈতিক দলকে এক ছাতার নিচে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে শুরু হওয়া এ উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত নতুন একটি রাজনৈতিক জোটে রূপ নিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী বাবুনগর মাদ্রাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অংশ নেয় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও নেজামে ইসলাম পার্টির প্রতিনিধিরা। প্রতিটি দলের তিনজন করে প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলামের অন্তত ২০ জন জ্যেষ্ঠ নেতা বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে কওমি ঘরানার দলগুলো ভবিষ্যতে ঐক্যবদ্ধভাবে চলার বিষয়ে নীতিগত সম্মতি দেয়। হেফাজতের আমির দলগুলোর কাছে লিখিত প্রস্তাব চেয়েছেন ও সম্ভাব্য ঐক্যের কাঠামো, একইসঙ্গে কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে মতামত আহ্বান করেছেন। আগামী আগস্টের শুরুতে আরেকটি বৈঠকে ঐক্যের রূপরেখা ও সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত হতে পারে।
বৈঠক শেষে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব আল্লামা সাজিদুর রহমান বলেন, সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাতটি দল একসঙ্গে থাকবে। তবে এ ঐক্যের কাঠামো বা ফর্মুলা কী হবে, তা শিগগিরই নির্ধারণ করা হবে।
হেফাজতের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বৈঠকের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটে থাকা কওমি ধারার দলগুলোকে নতুন উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা। যদিও এ বৈঠকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ছাড়ার কোনো সিদ্ধান্ত বা আলোচনা হয়নি। তবে সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ হলে ভবিষ্যতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙন দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাতটি দল ঐক্যবদ্ধ হলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ছাড়বে কি না জানতে চাইলে দলটির মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে আমরা একটা প্ল্যাটফর্মে আছি। জোট ছেড়ে দিয়ে সাত দল মিলে একটি জোট হবে, এ রকম আলোচনা ওই বৈঠকে হয়নি। আমরা জামায়াত জোট ছাড়ব কি না, সেটা পরামর্শ করে জানাব। জামায়াত জোটে থেকেও সাত দলের সঙ্গে নীতিগতভাবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ আছে।’
হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে ইসলামি দলের জোট হলেও জোটের নেতৃত্বে তিনি থাকছেন না বলে জানিয়েছেন হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দলেরই নিজস্ব মতামত আছে। তারা কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও ঐক্যের চেষ্টা করবেন। সাতটি দলের নেতৃত্বে কারা থাকবেন, এখনই বলা যাচ্ছে না। এটা আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হবে। তবে হেফাজতের আমির রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে থাকবেন না। রাজনৈতিক দলের নেতারাই সেখানে নেতৃত্বে দেবেন। তিনি তাদের দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ দেবেন।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ত্রয়োদশ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে কিছুটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে বা দূরত্ব বাড়ছে। দূরত্ব কমানোর জন্য হেফাজতের আমিরের নেতৃত্বে মিটিংটা হয়েছে। এখানে জোট হওয়া বা জোটের নেতৃত্বে কারা আসবে, এতদূর পর্যন্ত মিটিংটা এগোয়নি।’
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসলামি দলগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্নমুখী হয়ে পড়ে।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যুক্ত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন শুরুতে সমঝোতায় থাকলেও পরে আটটি আসনে স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচন করে। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রথমে সমঝোতার আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত ২৫৯টি আসনে নিজস্ব প্রার্থী দেয়।
নির্বাচনকেন্দ্রিক এসব রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে হেফাজতের শীর্ষ আলেমদের একটি অংশের দূরত্ব তৈরি হয়। একইসঙ্গে বিভিন্ন দলের নেতাদের মধ্যেও মতপার্থক্য বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনাও দেখা যায়। সেই দূরত্ব কমিয়ে ধর্মীয় ও জাতীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সমন্বিতভাবে কাজ করার লক্ষ্যেই এ ঐক্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কেকে/এলএ