এক সপ্তাহের অধিক সময় ধরে টানা ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় কক্সবাজারের চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদ তলিয়ে গেছে। এতে দুই উপজেলায় পানিবন্ধি হয়ে পড়ে প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষাধিক বানবাসি মানুষ। বন্যার পানিতে ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকার ফসলী জমি ও সবজি ক্ষেতের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা, আউশ ধান এবং গ্রীষ্মকালীন রকমারি নানা শাক-সবজির আবাদ।
এতে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন প্রান্তিক চাষিরা। প্রবল ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর দুই তীরসহ উপজেলার অন্তত ১৫টি ইউনিয়নের রোপা আমন, আউশ, বীজতলা ও সবজি ক্ষেত তলিয়ে গেছে বানের পানিতে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলি জমি ও রকমারি সবজি ক্ষেত তছনছ হয়ে যায়। বন্যায় প্রান্তিক চাষিরা চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কৃষকের মাথায় হাত উঠেছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যাযের তথ্যমতে এবারের ভয়াবহ বন্যায় কৃষি খাতে দুই উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় প্রায় ১৭ কোটি ৩৫ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবী করেছেন কৃষি বিভাগ। চকরিয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৫২ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১ হাজার ৬৬১ হেক্টর কৃষি জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জমিতে ফলানো অগ্রীম রকমারি সবজি বিক্রি করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার মুহূর্তেই এ বারের বন্যায় কৃষকের সবস্বপ্ন ধুলিসাৎ করে দিয়েছেন। সবকিছু হারিয়ে পথে বসেছেন কৃষকরা। রবিবার বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে সরেজমিনে এই চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।
জানা গেছে, টানা ভারি বর্ষণে বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে উপজেলার সবজি ভান্ডার মাতামুহুরী নদীর দুই তীর এবং উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের অন্তত ৬৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন রকমারি সবজির আবাদ করেন প্রান্তিক চাষিরা। চলতি সবজি উৎপাদন মৌসুমে ৬৫০ হেক্টর জমির কাঁকরোল, তিতকরলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, বরবটি, শসাসহ রকমারি সবজির আবাদ হয়। চকরিয়া উপজেলার বন্যা কবলিত ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকায় সবজি ক্ষেত বানের পানিতে তলিয়ে যায়। আবাদ করা সবজির ৬৫০ হেক্টর জমির মধ্যে ৩৬০ হেক্টর রকমারি সবজির আবাদ সম্পূর্ণ ভাবে ক্ষতি হয়েছে। এসব সবজি ক্ষেত থেকে সবজি তুলে বাজারে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কিন্তু আকষ্মিক ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল সৃষ্ট বানের পানিতে হাজারো কৃষকের স্বপ্নসহ সবকিছুই সর্বনাশ করে দিয়েছে।
এছাড়াও চলতি মৌসুমে চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলায় রোপা আমনের বীজতলা ও আউশের আবাদ হয় ১হাজার ৫শত ৩০ হেক্টর। এতে ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৪শত ৩৫ হেক্টর। তৎমধ্যে রোপা আমনের বীজতলা ক্ষতি হয়েছে ১শত হেক্টর এবং আউশ আবাদে ক্ষতি হয়েছে ৯ শত ৬০ হেক্টর। এ ছাড়াও বন্যায় ক্ষতি হয়েছে ৬ হেক্টর পানের বরজ।
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, চকরিয়া উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভায় কয়েক হাজার কৃষক রকমারি সবজির আবাদ করেন। কৃষকেরা কিছু কিছু সবজি ক্ষেত থেকে রকমারি সবজি তুলে বাজারেও নিয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় বেশি ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে প্রান্তিক কৃষকেরা। চলতি মৌসুমে যে ভাবে ফসসি জমির রোপা আমনের ধানের বীজতলা, আউশ ও রকমারি সবজি ক্ষেত বন্যার পানিতে তলিয়ে নিয়ে গেছে তাতে মনে হয় না এই মৌসুমে নতুন করে আবাদ করে ঘুরে দাঁড়ানোর।
এবারের বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা, বমুবিলছড়ি, কৈয়ারবিল, বরইতলী, হারবাং, বিএমচর, পূর্ব বড় ভেওলা, কোনাখালী, ঢেমুশিয়া, পশ্চিম বড় ভেওলা, সাহারবিল, চিরিংগা, ফাঁসিয়াখালী ও পৌরসভায়। এসব ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মাতামুহুরি নদীর তীরবর্তী যেসব সবজির আবাদ হয়েছিল তা ভয়াবহ বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। এতে কৃষকেরা চরম ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের কৃষক জোনায়েদ বলেন, গ্রীষ্মকালীন ৪০ শতক জমিতে বরবটি, চিচিঙ্গা, তিতকাকরোল ও শসা চাষ করেছিল। এতে চাষাবাদে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ব্যয়ে করেছেন। ফলন শুরু হওয়ার সাথে সাথে বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় এবং ক্ষেতের সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
কাকারা ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) শফিউল আলম বলেন, কাকারা ইউনিয়ন মাতামুহুরী নদী বেষ্টিত। তাই শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে সবজিচাষ হয়। বন্যার তাণ্ডবে সবজি চাষিদের এখন মাথায় হাত উঠেছে।
সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা তরুণ বিএনপি নেতা সাইফুল কবির চৌধুরী দাবি করেছেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় পুরো এলাকাজুড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর তীরবর্তী এলাকায় সকল সবজি ক্ষেত পানির প্রবল স্রোতে তলিয়ে যায়। এতে বড় ধরণের ক্ষতি হয় কৃষকের।
কৈয়ারবিল ইউনিয়নের মাতামুহুরী নদীর তীরবর্তী খিলছাদক এলাকার কৃষক মহিউদ্দিন বলেন, এবারের ভয়াবহ বন্যার কারণে তার ৬০ শতক জমিতে আবাদ করা ঢেঁড়স, ককরোল ও বেগুনের ক্ষেত পানিতে ডুবে নষ্ট গেছে। ককরোল ও ঢেঁড়স ফলন শুরু হওয়ার পরই বিক্রি সবেমাত্র শুরু করেছি। এতে বন্যার পানিতে আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। এখন জমিতে মৃত গাছ ছাড়া কিছুই নেই। এতে অন্তত তিন লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
কৃষকেরা জানায়, মাতামুহুরী নদীর তীরের প্রায় ৬৫০ হেক্টর জমিতে রকমারি চাষ করেছেন। তৎমধ্যে কাকরোল, তিত করলা, ঝিঙে, চিচিঙ্গা, বরবটি, শসাসহ বিভিন্ন রকমারি সবজি। ইতোমধ্যে এসব ক্ষেতে ফলনও এসেছে। বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তাদের কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রান্তিক চাষিরা দাবী করেছেন।
চকরিয়া উপজেলা বর্গাচাষী সমিতির সভাপতি মহিউদ্দিন পুতু বলেন, টানা ভারিবর্ষণে ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় দুই উপজেলায় ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রোপা আমনের বীজতলা, আউশ ধান, শাকসবজি পানিতে তলিয়ে গিয়ে কৃষক আজ অসহায় অবস্থায়। সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি, অবিলম্বে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করে বিনামূল্যে বীজ, সার ও পর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হোক। অন্যথায় অচিরেই চকরিয়াসহ পুরো অঞ্চলে খাদ্য সংকট দেখা দেবে।
চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার দায়িত্বরত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শাহনাজ ফেরদৌসী বলেন, ভয়াবহ বন্যায় দুই উপজেলায় ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাঠ পর্যাযের তথ্যমতে এবারের ভয়াবহ বন্যায় কৃষি খাতে উপজেলার ১৮ ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় ১৭ কোটি ৩৫ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।
তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে জমিতে আবাদ করা রোপা আমন, আউশ, বীজতলা ও রকমারি ফলানো সবজি বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবানের চেয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাতামুহুরী নদীর দুই তীরসহ উপজেলার অন্তত ১৫টি ইউনিয়নের ফসলি জমি ও সবজি ক্ষেত বানের পানিতে নিমজ্জিত ছিল। এতে বিস্তীর্ণ এলাকায় ফসলি জমি ও রকমারি সবজি ক্ষেত সর্বনাশ হয়ে যায়। যেসব চাষিরা ক্ষতির শিকার হয়েছেন তাদেরকে প্রণোদনা এবং নতুন করে বীজ সরবরাহ করার বিষয়টি মাথায় রয়েছে। যাতে প্রান্তিক কৃষকেরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারেন।
কেকে/ এমএস