এক সময় ফরিদপুরের গ্রামবাংলার পথঘাট, বাড়ির আঙিনা কিংবা পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকত সবুজের নীরব প্রহরী। বড় বড় পাতার ফাঁকে ফুটত শুভ্র ফুল, আর বর্ষা পেরিয়ে ডালে ঝুলত শক্ত খোসার টক-মিষ্টি ফল—চালতা। ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, সালথা, নগরকান্দাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় একসময় এ দেশীয় বৃক্ষের দেখা মিললেও সময়ের বিবর্তনে এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে সেই পরিচিত দৃশ্য।
প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বদলেছে। বদলেছে বসতভিটা, কৃষিজমি ও গ্রামীণ পরিবেশের চেহারা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশীয় বৃক্ষ সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব এবং চালতা গাছের উপকারিতা ও পরিচর্যা সম্পর্কে সঠিক তথ্য না জানা। ফলে নতুন করে চালতা গাছ লাগানোর আগ্রহও অনেকের মধ্যে কমে যাচ্ছে।উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের কাছে চালতা পরিচিত Dillenia indicaL নামে। এটি Dilleniaceae পরিবারের একটি বৃক্ষ। ইংরেজিতে একে বলা হয় Elephant Apple। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে এর বিস্তৃতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়ামের উদ্ভিদ নমুনা তথ্যভান্ডারেও Dillenia indica প্রজাতির চালতার নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে। চালতা মূলত মাঝারি থেকে বড় আকারের বৃক্ষ। বিভিন্ন উদ্ভিদবিষয়ক সূত্রে এর উচ্চতা সাধারণত প্রায় ৮ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে; অনুকূল পরিবেশে এর চেয়েও বড় হতে পারে। বড়, মোটা ও চকচকে সবুজ পাতা এবং বিস্তৃত ডালপালা গাছটিকে সহজেই চেনার মতো করে তোলে।
চালতার বড় ও দৃষ্টিনন্দন সাদা ফুল প্রকৃতির এক অনন্য সৌন্দর্য। বাংলাদেশে সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষার শুরুর দিকে, বিশেষ করে মে-জুন থেকে ফুল আসতে শুরু করে। তবে অঞ্চল ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে ফুলের সময় কিছুটা এগিয়ে-পিছিয়ে যেতে পারে। বিভিন্ন উদ্ভিদতাত্ত্বিক তথ্যসূত্রে মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত ফুল ফোটার তথ্য পাওয়া যায়।
ফুলের পর ধীরে ধীরে ফল বড় হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও উদ্ভিদবিষয়ক সূত্রে চালতার ফল শীতের শুরু থেকে শীতকাল এবং কিছু অঞ্চলে পরবর্তী সময় পর্যন্ত পরিপক্ব হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ফুল ফোটার পর ফল পরিপক্ব হতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগে। চালতার ফল দেখতে বড়, সবুজ ও শক্ত। এর মাংসল অংশ টক স্বাদের হওয়ায় বাঙালির রান্নাঘরে এর আলাদা কদর রয়েছে। চালতা দিয়ে আচার, চাটনি, টক ডালসহ নানা ধরনের খাবার তৈরি হয়। ফলের খাওয়ার অংশে পানি, কার্বোহাইড্রেট, আঁশ, খনিজ উপাদান ও ভিটামিন সি পাওয়া যায় বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গৃহবধূ শিল্পী বলেন, ‘চালতার আচার আমার অনেক পছন্দের। ভাতের সঙ্গে টক ডাল আর একটু চালতার আচার থাকলে খেতে বেশ ভালো লাগে। চালতার টক-মিষ্টি স্বাদটা টক ডালের সঙ্গে খুব সুন্দর মানিয়ে যায়। বাসায় ছোট-বড় সবাই বেশ মজা করে খায়। দেশীয় ফল দিয়ে তৈরি বলে চালতার আচার আমাদের খাবারের স্বাদও বাড়ায়, পাশাপাশি পুষ্টিগুণের দিক থেকেও বেশ ভালো।’
হারিয়ে যাওয়া গাছের জন্য আক্ষেপ করে বৃক্ষপ্রেমী সুমন রাফি বলেন,‘এক সময় ফরিদপুরের গ্রামাঞ্চলে চালতা গাছ খুব পরিচিত ছিল। বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী, সালথা, নগরকান্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির আশপাশে কিংবা গ্রামের নিরিবিলি জায়গায় চালতা গাছ দেখা যেত। এখন সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মানুষ অনেক সময় এই গাছের গুরুত্ব না জেনেই গাছ কেটে ফেলছে কিংবা নতুন করে চারা লাগানোর কথা ভাবছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘চালতা শুধু একটি ফলের গাছ নয়; এটি আমাদের দেশীয় জীববৈচিত্র্য ও গ্রামীণ সংস্কৃতির অংশ। নতুন প্রজন্মের কাছে এ গাছের পরিচয় তুলে ধরতে হবে। বাড়ির আঙিনা, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, রাস্তার পাশ কিংবা উপযুক্ত পতিত জমিতে চালতার চারা লাগানো যেতে পারে। একটি গাছ লাগিয়ে সেটির পরিচর্যা করলেই ভবিষ্যতে আবার গ্রামবাংলার সেই চেনা দৃশ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার ময়না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কালিপদ চক্রবর্তী বলেন, ‘আগের প্রজন্মের মানুষ দেশীয় গাছপালা সম্পর্কে অনেক বেশি জানতেন। এখনকার শিশুরা অনেক গাছের নাম জানে না, দেখলেও চিনতে পারে না। চালতাও ধীরে ধীরে সেই হারিয়ে যেতে বসা গাছের তালিকায় চলে যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয় থেকেই শিশুদের দেশীয় বৃক্ষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে চালতা, আমলকী, বহেড়া, হরীতকীসহ বিভিন্ন দেশীয় বৃক্ষ লাগানো যেতে পারে। শিক্ষার্থীরা নিজের হাতে গাছ লাগালে তার প্রতি মমত্ববোধও তৈরি হবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হলে প্রকৃতির গাছগুলোকে আগে চিনতে হবে।’
কেকে/এআই