মানবজাতির প্রতি মহান আল্লাহর প্রথম নির্দেশই ছিল ‘ইকরা’—পড়ো। জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আলোকিত সমাজ গঠনের সেই চিরন্তন আহ্বানকে ধারণ করেই মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে শুরু হয়েছে ব্যতিক্রমী আয়োজন ‘বই পড়া উৎসব-২০২৬’।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকাল ১০টায় শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে এ উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।
ডিজিটাল যুগে, যখন মোবাইলের পর্দা ক্রমেই বইয়ের জায়গা দখল করে নিচ্ছে, তখন নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, জ্ঞানচর্চাকে উৎসাহিত করা এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে উপজেলা প্রশাসন শ্রীমঙ্গলের এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ উপজেলাজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়াচ্ছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের উৎসবে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক/স্নাতকোত্তর এবং উন্মুক্ত বিভাগ মিলিয়ে ২৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীর অংশগ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উৎসবটি অনুষ্ঠিত হবে ‘মুকুল’, ‘ফুল’ ও ‘ফল’—এই তিন ধাপে। প্রতিটি ধাপে অংশগ্রহণকারীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের নির্বাচিত গল্প, উপন্যাস ও অন্যান্য গ্রন্থ পাঠ করে লিখিত ও মৌখিক মূল্যায়নে অংশ নিতে হবে। এক ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করেই এগিয়ে যেতে হবে পরবর্তী ধাপে। অর্থাৎ, একজন প্রতিযোগী পুরো উৎসবজুড়ে পাঠ করবেন তিনটি ভিন্ন বই—যা নিঃসন্দেহে জ্ঞান ও পাঠের এক অনন্য যাত্রা।
প্রায় দেড় মাসব্যাপী চলবে এই বই পড়া উৎসব। এবার শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরের যেকোনো বয়সী বইপ্রেমীরাও উন্মুক্ত বিভাগে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। খুব শিগগিরই এ বিভাগের নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও বইয়ের তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান।
প্রতিযোগিতায় সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত রয়েছে শ্রীমঙ্গল আবৃত্তি উৎসব এবং পাঠ-সহযোগী হিসেবে কাজ করছে কলেজ রোডস্থ ‘উত্তরণ’।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও বিভাগীয় প্রধান সাইফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে বই পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা প্রশাসনের এ ব্যতিক্রমী আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। এ ধরনের চর্চার ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করছি।
অভিভাবক ও শিক্ষকদের মতে, বই পড়া প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মননশীলতা, পাঠাভ্যাস এবং নৈতিক গুণাবলীর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তারা আশা করছেন, এ ধরনের কার্যক্রম আগামীতে আরও সম্প্রসারিত হবে এবং পাঠাভ্যাসের প্রতি আগ্রহ আরও বৃদ্ধি পাবে।
শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা জানান, বই পড়ার চর্চা বৃদ্ধিতে এ ধরনের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত কার্যকর। তারা বলেন, এটি শিক্ষার্থীসহ বইপ্রেমীদের জীবনে পাঠের গুরুত্ব বোঝাতে সাহায্য করবে।
স্থানীয় লেখক ও সাহিত্যিকরা বলেন, এ আয়োজন মানুষের মানসিক বিকাশ, পাঠাভ্যাস এবং শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তারা আশা করছেন।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান জানান, একটি বই কেবল গল্পের ভাণ্ডার নয়; একটি বই নতুন চিন্তার দুয়ার খুলে দেয়, কল্পনাকে বিস্তৃত করে, মূল্যবোধ গড়ে তোলে এবং একজন মানুষকে আলোকিত করে। আর আলোকিত মানুষই গড়ে তোলে একটি সুন্দর সমাজ। তাই বই পড়া হোক কেবল প্রতিযোগিতার জন্য নয়, বরং আজীবনের অভ্যাস।
তিনি আরও বলেন, “বই পড়ি, মন গড়ি, জ্ঞান হোক শক্তি, পাঠ হোক সংস্কৃতি।” এই প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থী ও যেকোনো বয়সের মানুষের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি সৃজনশীল চিন্তাভাবনা এবং আত্মপ্রকাশের সুযোগও তৈরি করবে।
কেকে/এলএ