হেপাটাইটিস বিসহ জনস্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট রোগ প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; এর পাশাপাশি সমাজ, সংস্কৃতি, মানুষের আচরণ ও সামাজিক বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও নৃবিজ্ঞানী এ কে এম মাজহারুল ইসলাম।
সোমবার (২৭ জুলাই ২০২৬) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) ভবনের শহীদ ডা. শামসুল আলম খান মিলন সভাকক্ষে ‘হেপাটাইটিস প্রতিরোধে প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম বলেন, কোনো রোগকে বোঝার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত ‘রোগ’, দ্বিতীয়ত ‘রোগীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা’ ও তৃতীয়ত ‘সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি’। যদিও চিকিৎসকরা সাধারণত রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার দিকে গুরুত্ব দেন। তবে রোগ সম্পর্কে রোগীর নিজস্ব উপলব্ধি ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি উপেক্ষিত হলে জনস্বাস্থ্য সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না।
তিনি জানান, গত ৩১ বছর চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেখেছেন রোগের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো বোঝা না গেলে বিভিন্ন ধরনের ব্যবধান তৈরি হয়। তাই সেই ব্যবধান দূর করতে সমাজকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
করোনাভাইরাস মহামারির উদাহরণ তুলে তিনি বলেন, শুরুতে এটিকে শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও পরে স্পষ্ট হয়েছে, এটি সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেসময় হাত ধোয়ার প্রচারণায় প্রবাহমান পানির ব্যবহার দেখানো হলেও দেশের অধিকাংশ মানুষের সেই সুবিধা ছিল না। ফলে জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তা কাক্সিক্ষত ফল দেয় না।
তিনি আরও বলেন, একজন রোগী, একজন চিকিৎসক ও সমাজ একই রোগকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। তাই কোনো রোগ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে রোগের বিভিন্ন ব্যাখ্যাকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ নৃবিজ্ঞানী বলেন, একটি রোগকে শুধু জীবাণু বা ভাইরাসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করলে চলবে না। এরসঙ্গে সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ওষুধনীতি এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়ও জড়িত থাকে। এসব বিষয় বিশ্লেষণ না করলে রোগের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না।
তিনি বলেন, একটি রোগকে কেন্দ্র করে অনেক সময় অন্য রোগ বা সামাজিক সমস্যার বিষয়ও সামনে আসে। ফলে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষণে রোগকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যদিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সমাজের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও আচরণগত ধারা রয়েছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আচরণগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। গণমাধ্যম, বিভিন্ন অংশীজন এবং সমাজের সব স্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে রোগের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আয়োজকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক আলোচনায় চিকিৎসকদের পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞানী ও চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানীদের সম্পৃক্ততা বাড়ানো সময়ের দাবি। এতে রোগ প্রতিরোধে আরও কার্যকর ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
খোলা কাগজের সম্পাদক আহসাহ হাবীব লেলিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. এবিএম খোরশেদ আলম ভূঞা, শ্যামলী টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার, সূর্যের হাসি নেটওয়ার্কের মো. আবদুল কাদের ভূঁইয়া, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. দীপক কুমার মিত্র, হেলথ কেয়ার ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ (মেডিকেল অ্যাফেয়ার্স) ডা. সাখি আজাদ, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, খোলা কাগজের নির্বাহী সম্পাদক মো. মনির হোসেন, প্রধান বার্তা সম্পাদক মো. সফিকুল ইসলাম, বার্তা সম্পাদক প্রণব আচার্য্য ও মো. রবিউল ইসলাম, প্রধান প্রতিবেদক আলতাফ হোসেনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা।
কেকে/ এমএস