কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোরের নেতৃত্বে আট সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। এ সময় নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবিতে তাদের সামনে আবেগঘন বার্তা তুলে ধরেন রোহিঙ্গারা।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) প্রতিনিধি দলটি উখিয়ার ক্যাম্প-৮ ওয়েস্ট, ক্যাম্প-৬ ও ক্যাম্প-৪’-এর বিভিন্ন স্থাপনা ও কার্যক্রম পরিদর্শন করেন।
প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাউন্সেলর এরিক জিলান, বিশেষ দূতের সিনিয়র উপদেষ্টা চার্লস হর্টন ও চেস্টার ক্রোগার, রিজিওনাল সিকিউরিটি অফিসের সহকারী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকর্তা ক্রিস অসবর্ন ও ইয়ান ডিক, ভিআইপি ভিজিট কো-অর্ডিনেটর মোহাম্মদ আহসান।
পরিদর্শনের শুরুতে প্রতিনিধি দল ক্যাম্প-৮ ওয়েস্টের এ/৫৮ ব্লকে অবস্থিত ওয়াচ টাওয়ারে উঠে ক্যাম্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আশপাশের রোহিঙ্গা শেল্টার এবং সার্বিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন।
এ সময় তাদের গাড়িবহরের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন রোহিঙ্গারা। একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল—“ইউ হ্যাভ ইউর হোম, উই মিস আওয়ার হোম” (আপনার নিজের বাড়ি আছে, আমরা আমাদের বাড়িকে মিস করি)।
ওয়াচ টাওয়ারসংলগ্ন সড়কে প্রায় ৬০ জন রোহিঙ্গা প্ল্যাকার্ড হাতে নিজ ভূমিতে নিরাপদ প্রত্যাবাসন, শরণার্থী জীবন থেকে মুক্তি ও রাখাইনে ফিরে যাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে প্রতিনিধি দলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।
ক্যাম্পের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে মিয়ানমারে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে অবস্থানের কারণে তারা অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এবং নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন।
রোহিঙ্গা নেতাদের ভাষ্য, বছরের পর বছর ক্যাম্পে বসবাসের ফলে তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে দ্রুত নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পথ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান তারা।
পরে প্রতিনিধি দল ক্যাম্প-৬’-এর ‘এ’ ব্লকে অবস্থিত আইআরসি হেলথ সেন্টার পরিদর্শন করেন। এরপর ক্যাম্প-৪’-এর ব্লক-১-এ অবস্থিত ই-ভাউচার ডাটা সেন্টার এবং এলপিজি ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারের কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।
পরিদর্শন শেষে বিকালে প্রতিনিধি দল কক্সবাজারের উদ্দেশে ক্যাম্প ত্যাগ করেন। সফরকালে তারা ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি বিতরণ কার্যক্রম ওসামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাদ্যসহ বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের এই উচ্চপর্যায়ের সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী জনগোষ্ঠীর সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা মূল্যায়নই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি শরণার্থী ক্যাম্পে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানের মুখে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তায় তাদের জন্য বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান দাতা দেশের ভূমিকা পালন করে আসছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সফর রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার এবং মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করবে।
উল্লেখ্য, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্দেশ্যে বিশেষ দূত সার্জিও গোর উখিয়া সফর করেন। ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রতিনিধি দলের ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে।
কেকে/এমএ