দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের (টিএসসি) ভূমিকা, বিদ্যমান সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার (১ আগস্ট) রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) সোশ্যাল গার্ডেনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
‘দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টিতে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ভূমিকা, সমস্যা ও সম্ভাবনা : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক সেমিনারটি আয়োজন করে বাংলাদেশ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ শিক্ষক সমিতি।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পখাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।’
একই সঙ্গে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোর অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট ও পাঠ্যক্রমের সীমাবদ্ধতা দূর করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা মো. রুহুল কবির রিজভী সেমিনারে বলেন, ‘দেশের কোনো শিক্ষার্থী যেন ঝরে না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যারা বিভিন্ন কারণে মূলধারার শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাদের কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ টেকনিশিয়ান গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।’
এ বিষয়ে শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সুপারিশ সরকার বিবেচনায় নেবে বলেও জানান রুহুল কবির।
বিশেষ অতিথি কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. দাউদ মিয়া বলেন, ‘জাতীয় অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে দক্ষ মানবসম্পদের বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারের দূরদর্শী ভাবনার আলোকে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। আমরা আর প্রচলিত সার্টিফিকেট-সর্বস্ব শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাই না। আমাদের মূল লক্ষ্য—দেশের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ, স্বাবলম্বী ও আন্তর্জাতিক মানের জনশক্তিতে রূপান্তর করা। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার জন্য আমরা ইতোমধ্যে পাঠ্যক্রম ও প্রশাসনিক রোডম্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেছি। দেশের প্রযুক্তিগত শিক্ষার পরিধি বাড়াতে ৪টি নতুন ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন এবং প্রতিটি উপজেলায় টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কেবল তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, বরং কর্মমুখী ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাই পারবে আমাদের যুবসমাজকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল করতে আমি শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।’
সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল খায়ের মো. আক্কাস আলী, আইডিইবির অন্তর্বর্তী কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার মো. কবীর হোসেন এবং সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার কাজী সাখাওয়াত হোসেন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মেহেরপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. ফয়েজুল বারী।
‘চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (টিভিইটি) গুরুত্ব বাড়লেও সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলো এখনও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। আধুনিক ল্যাব ও যন্ত্রপাতির অভাব, দীর্ঘদিনের শিক্ষকসংকট ও শিল্প খাতের সঙ্গে দুর্বল সংযোগের কারণে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং ও ইলেকট্রিক ভেহিকল প্রযুক্তির মতো দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু দেশের কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম সেই গতিতে হালনাগাদ হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে অনেক তরুণ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।’
মূল প্রবন্ধে ফয়েজুল বারী চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইনের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক তুলে ধরে আধুনিক ল্যাব স্থাপন, শিক্ষকদের শিল্প-প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ট্রেড চালু ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।
তার মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দক্ষ জনবল তৈরি, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি মো. আহসানুল হাবিব খান। স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আ স ম. আহছান উল্লাহ্।
কেকে/এমএ