কেউ অবসরে রুবিকস কিউব মেলায়, কেউ কম্পিউটার প্রোগ্রামিং করে, কেউ দাবা খেলে কিংবা ছবি আঁকে। বয়সে সবাই প্রাথমিকের গণ্ডিতে, অথচ স্বপ্ন তাদের এমআইটিতে পড়া, বিজ্ঞানী কিংবা কার্ডিয়াক সার্জন হওয়া। এই ১৬ খুদে শিক্ষার্থীই এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
আগামী ২-৭ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম জাভার দীপক শহরে বসছে আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের (আইএমএসও) ২৩ তম আসর। এবারের আসরের আয়োজক ইন্দোনেশিয়ার ম্যাথমেটিকস এডুকেশন ক্লিনিক এবং দেশটির প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ দলে গণিতে আটজন ও বিজ্ঞানে আটজন শিক্ষার্থী রয়েছে।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের সদস্যদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতির (এসপিএসবি) সভাপতি মুনির হাসান।
তিনি বলেন, “গত বছর প্রথমবার অংশ নিয়েই আমাদের ১২ জন শিক্ষার্থীর সবাই পদক জিতেছিল। এবার দল বড় হয়েছে, প্রস্তুতিও গভীর হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়েই গণিত ও বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে পারলে, সেটিই একদিন দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে উঠবে।”
৮০০ থেকে ১৬: দল গড়ার পথ :
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের গণিত ও বিজ্ঞানে আগ্রহী করে তুলতে গত বছর যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড (বিডিএমএসও)। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত হলো এই প্রতিযোগিতা।
গত ৮ আগস্ট ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুরে একযোগে জাতীয় পর্বে অংশ নেয় প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থী। বিজয়ীদের নিয়ে ১১-২০ আগস্ট চলে জাতীয় অনলাইন ক্যাম্প। এরপর ২১ ও ২২ আগস্ট গণিত ও বিজ্ঞানের দল নির্বাচনী পরীক্ষায় চূড়ান্ত হয় ১৬ জন।
নির্বাচিত দলের জন্য ১৫-১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আয়োজন করা হয় আবাসিক প্রস্তুতিমূলক ক্যাম্প। সেখানে হাতেকলমে পরীক্ষাগার অনুশীলন আর সমস্যা সমাধানে দিন কেটেছে শিক্ষার্থীদের।
বিজ্ঞান দলের মেন্টর মিম নাজ রহমান বলেন, “ক্যাম্পে আমরা মুখস্থ নয়, ভাবতে শেখানোর ওপর জোর দিয়েছি। পরীক্ষাগারে নিজের হাতে এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে ওদের চোখে যে আগ্রহ দেখেছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
স্বপ্ন আর প্রস্তুতি :
দলের প্রত্যেক সদস্যই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার জন্য রোমাঞ্চিত, একই সাথে প্রথমবারের মতো বিশ্বের নানা দেশের সমবয়সীদের সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগও।
বিজ্ঞান দলের তাহমিদ হাসান বলেন, “প্রথমবার দেশের বাইরে গিয়ে অন্য দেশের প্রতিযোগীদের সঙ্গে পরীক্ষা দেব। একটু ভয় লাগছে, কিন্তু আনন্দ তার চেয়ে অনেক বেশি। দেশের জন্য পদক আনতে চাই।”
সন্তানের এই যাত্রায় গর্বিত অভিভাবকেরাও :
দলের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য রাইয়ান আফরাদের অভিভাবক হুমায়ুন কবির বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ও প্রশ্ন করতে ভালোবাসে। সেই কৌতূহল যে ওকে দেশের পতাকা হাতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিয়ে যাবে, ভাবিনি। আয়োজকদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।”
বাংলাদেশ দলের সদস্য :
গণিত দল :
সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র অরিজিৎ সাহা, শ্রেণির আলী ওমর, মো. নাবি হোসেন, ইহান আবরাদ রহমান, মো. সামিন সাইফ, শারাফ বিন আনোয়ার ও মো. শাহিদ মোরসালিন, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইরতিশ জায়েদ লিয়াম।
বিজ্ঞান দল :
মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তাহমিদ হাসান, এসএফএক্স গ্রিনহেরাল্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী অভিজ্ঞান রায় গল্প, সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সাহাবী ইবনে কাব্য, সিরাজগঞ্জের বনওয়ারী লাল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাফসান শফিক তালুকদার ও বাসিরাহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আরহাম আবিদ, ময়মনসিংহ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণি মো. মিফতাহুল ইসলাম, সেন্ট জোসেফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণি রাইয়ান আফরাদ এবং এজি চার্চ স্কুলের চতুর্থ শ্রেণি মোহাম্মদ মুশরিফ আলম।
দলনেতা ও মেন্টর :
বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) ও এসপিএসবির সভাপতি এবং আইএমএসও বাংলাদেশের কান্ট্রি কোঅর্ডিনেটর মুনির হাসান দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সহকারী দলনেতা হিসেবে রয়েছেন বিডিওএসএনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. তানভীরুল ইসলাম। দলটির গণিত দলের মেন্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বুয়েটের আর্কিটেকচার বিভাগের সামিরা সুমাইয়া এবং বিজ্ঞান দলের মেন্টর হিসেবে রয়েছেন রুয়েটের ট্রিপলই (ইইই) বিভাগের মিম নাজ রহমান।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আয়োজন করে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন) ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান জনপ্রিয়করণ সমিতি (এসপিএসবি) ও ম্যাসল্যাব।
বলে রাখা ভালো, আন্তর্জাতিক গণিত ও বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। ইন্দোনেশিয়ার উদ্যোগে শুরু হওয়া এই অলিম্পিয়াড এখন প্রতিবছর বিভিন্ন দেশে আয়োজিত হয়। এতে অংশ নিতে পারে ১৩ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীরা। গত বছর মালয়েশিয়ার কেদাহে ২২তম আসরে প্রথমবার অংশ নিয়েই শতভাগ সাফল্য পায় বাংলাদেশ। দলের ১২ জনের সবাই পদক জেতে ২টি রৌপ্য ও ১০টি ব্রোঞ্জ।
কেকে/এমএ